ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

বিশেষজ্ঞ মত

ডেঙ্গু টিকাই কি আশার আলো

ডেঙ্গু টিকাই কি  আশার আলো
×

ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ

ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালের বা রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার ও ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে শুধু মশা নিধন ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির ওপর নির্ভর করে কি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? নাকি এখন টিকা ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সময় এসেছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে বসবাস করছে। বাংলাদেশেও ডেঙ্গু নতুন কোনো রোগ নয়। ২০০০ সালের দিকে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের পর এটি জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে সামনে আসে। এরপর সময়ের সঙ্গে রোগটির প্রকোপ বেড়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমবেশি সারাবছরই দেখা যাচ্ছে।

ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু ভাইরাসকে সরাসরি ধ্বংস করার মতো কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধও নেই। ফলে চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো উপসর্গ অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ এবং জটিলতা প্রতিরোধ। এ অবস্থায় প্রতিরোধের কার্যকর উপায় হিসেবে টিকার গুরুত্ব স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান সেরোটাইপ ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। একটি কার্যকর টিকার ক্ষেত্রে চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গুর টিকা তৈরির ক্ষেত্রে এটাই অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ।

ডেঙ্গুর টিকা তৈরির চেষ্টা অনেক বছর ধরেই চলছে। এরই মধ্যে ডেংভ্যাক্সিয়া ও কিউডেঙ্গা নামে দুটি টিকা আলোচনায় এসেছে। তবে দুটির বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ডেংভ্যাক্সিয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন কিনা, তা বিবেচনা করতে হয়। যাদের আগে ডেঙ্গু হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে এই টিকা ব্যবহারে গুরুতর জটিলতার আশঙ্কা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। তাই টিকা দেওয়ার আগে ব্যক্তির পূর্ববর্তী ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস বা পরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে ডেংভ্যাক্সিয়াকে সর্বজনীন ডেঙ্গু টিকা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বিশেষ করে শিশু ও আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। অন্যদিকে কিউডেঙ্গার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো আগে ডেঙ্গু হয়েছিল কিনা, তা বিবেচনা না করেও এটি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। টিকাটি দুই ডোজে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং কয়েকটি দেশে বড় পরিসরে প্রয়োগও করা হচ্ছে।

তবে কোনো টিকা বিদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেই বাংলাদেশে তা দ্রুত চালু করে দেওয়া উচিত– এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী, ডেঙ্গুর সেরোটাইপের বিস্তার, বয়সভিত্তিক সংক্রমণ, টিকার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা– সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের একটি বড় অংশ শিশু ও কিশোর। শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। ফলে শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জাতীয় পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

কিউডেঙ্গা নিয়ে বিভিন্ন দেশে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে, তা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশের ফলাফল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে টিকাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর, কতদিন সুরক্ষা দেয় এবং গুরুতর ডেঙ্গু ও হাসপাতালে ভর্তি কমাতে এর ভূমিকা কতটা।

বাংলাদেশে টিকা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট বয়সসীমার শিশু-কিশোর বা উচ্চঝুঁকির জনগোষ্ঠীকে নিয়ে পর্যায়ক্রমে কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়টিও বিশেষজ্ঞরা বিবেচনা করতে পারেন।

ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে গবেষণা থেমে নেই। টেট্রাভ্যালেন্ট টিকা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এক ডোজে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরির সম্ভাবনা। বিভিন্ন দেশে এ টিকার ক্লিনিক্যাল গবেষণা হয়েছে এবং আরও গবেষণা চলছে।

বিজ্ঞান ও গবেষণা যত এগোবে, ডেঙ্গুর জন্য আরও নিরাপদ, কার্যকর ও সহজে প্রয়োগযোগ্য টিকা পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। আমাদের উচিত এসব গবেষণার ফলাফল নিবিড়ভাবে অনুসরণ করা এবং বাংলাদেশের জন্য কোন টিকা কতটা উপযোগী, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুর টিকা পাওয়া গেলেই মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না; বরং টিকা ও মশা নিয়ন্ত্রণ দুটি ব্যবস্থাকেই সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হবে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে শুধু চিকিৎসা ও টিকার ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ছাদ ও অন্যান্য সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে শুধু কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তৎপর হয়ে উঠব আর অন্য সময় বিষয়টি ভুলে যাব– এভাবে চললে দীর্ঘ মেয়াদে সুফল পাওয়া যাবে না। বছরের শুরু থেকেই ডেঙ্গুর সম্ভাব্য মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। টিকার বিষয়ে আবেগ বা তাড়াহুড়ো নয়, প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন। একই সঙ্গে টিকা নিয়ে গবেষণার অগ্রগতি, বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা দরকার।

ডেঙ্গু এখন সারাদেশের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তাই এর সমাধানও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত। কার্যকর ও নিরাপদ টিকা আমাদের জন্য নতুন একটি প্রতিরোধের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু সেই পথের পাশাপাশি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

লেখক: মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×