ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

শসার ক্ষেতে নতুন দিনের স্বপ্ন

শসার ক্ষেতে নতুন দিনের স্বপ্ন
×
×

সকাল হতেই শসা নিয়ে বাজারে জড়ো হয়েছেন কৃষক। সম্প্রতি কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের জুমপাড়া বাজারে তোলা -সমকাল

 ইব্রাহিম খলিল মামুন, কক্সবাজার ও হিরু আলম, পেকুয়া

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১৬ | আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাবার রেখে যাওয়া চার বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা বিক্রি করে মালয়েশিয়া যান বশির আহমেদ। কিন্তু ভাগ্য ফেরেনি। এক পর্যায়ে ভিসাহীন হয়ে পড়েন। দুই মাস জেল খেটে ছয় বছর আগে শূন্য হাতে দেশে ফেরেন। আয় না থাকায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন বশির। এলাকার একজনের শসাক্ষেতে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই শসা চাষের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। চার বছর আগে তিন বিঘা জমিতে শসার আবাদ শুরু করেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রতি বছর কয়েক লাখ টাকার শসা বিক্রি করছেন বশির। ইতোমধ্যে ব্যাটারিচালিত দুটি অটোরিকশা কিনেছেন। সেগুলো ভাড়া দিয়ে প্রতিদিন ভালো আয় করছেন। কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের মালগাড়া গ্রামের এই বাসিন্দার মতো শতাধিক কৃষকের ভাগ্য ফিরেছে শসা আবাদ করে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার প্রায় ২৪ হেক্টর জমিতে শসা চাষ হয়। এর মধ্যে শুধু মালগাড়াতেই চাষ হয় ১৫ হেক্টর জমিতে। একসময় এসব জমিতে ধান চাষ হতো। কিন্তু বছরের পর বছর আশানুরূপ ফলন না পাওয়ায় কৃষকদের অনেকেই ধান চাষে আগ্রহ হারান। কৃষি বিভাগের পরামর্শে সেই জমিতেই শসা চাষ শুরু করেন তারা। লাভজনক হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে বদলে যায় পুরো এলাকার কৃষিচিত্র।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে কক্সবাজারে ১২৬ হেক্টর জমিতে শসা চাষ হয়েছে। এর মধ্যে জমির হিসাবে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় চকরিয়ায়; ৩০ হেক্টর। তবে এই উপজেলায় বিচ্ছিন্নভাবে শসা চাষ হয়ে থাকে। এদিকে রামুতে ২০ হেক্টর, সদর উপজেলায় শূন্য দশমিক ৫ হেক্টর, ঈদগাঁওতে ১ হেক্টর, উখিয়ায় ২০ হেক্টর, টেকনাফে ২৫ হেক্টর, মহেশখালীতে ৫ হেক্টর এবং কুতুবদিয়া উপজেলায় ১ হেক্টর জমিতে শসা চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকার শসা বেচাকেনা হয়েছে।

কৃষকরা জানান, শসা চাষের মৌসুম শুরু হয় জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে। বিক্রি চলে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এক কানি (সোয়া এক বিঘা) জমিতে প্রায় পাঁচ হাজার শসার বীজ বপন করা যায়। চারা গজানোর পর ফুল আসতে সময় লাগে ৫০ থেকে ৫৫ দিন। এর পর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন ধরে দুই থেকে তিন দিন পরপর শসা তোলা যায়। একটি গাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত ফলন মেলে। প্রতিটি শসার ওজন গড়ে ৮০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ২০০ গ্রাম হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি শসা বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। সেই হিসাবে প্রতি মণ শসা এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

কৃষকদের হিসাবে, এক কানি জমিতে মাটি তৈরি, বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এক মৌসুমে খরচ হয় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। বিপরীতে মৌসুমে আয় হয় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা। মালগাড়ায় মূলত স্থানীয় জাতের শসার চাষ হয়। এ জাতের শসার ফলন তুলনামূলক বেশি এবং আকারও বড়। 

মালগাড়ার কৃষক কামাল হোছাইন বলেন, পাঁচ কানি বা প্রায় ছয় বিঘা জমিতে শসা চাষ করেছেন। এক কানি জমি থেকে প্রতিবার শসা তোলার দিনে গড়ে ৩৫ থেকে ৫০ মণ পর্যন্ত পাওয়া যায়। বিক্রি হয় ৪২ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকায়। 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফারুক হোসেন চৌধুরী জানান, ধান চাষে লোকসান ও আশানুরূপ ফলন না পাওয়ার কথা জানিয়ে টৈটং ইউনিয়নের মালগাড়া ও জুমপাড়ার কয়েকজন কৃষক তার কাছে এসেছিলেন। মাঠ পরিদর্শন ও মাটি পরীক্ষা করে তাদের শসা চাষের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে কৃষকরা শসা চাষ করে সফলতা পান।

ভোরে শসা তোলা শুরু হয়। আলো ফুটতেই দুই-তিন কিলোমিটার দূরে কাঁধে শসার ভার নিয়ে কৃষকরা যান জুমপাড়া বাজারে। তাদের আনা শসায় ভরে ওঠে বাজার। সম্প্রতি জুমপাড়া বাজারে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে শসার ভার কাঁধে নিয়ে কৃষকরা বাজারে ঢুকছেন। তারা আসার আগেই দূরদূরান্ত থেকে পাইকার এসে অপেক্ষা করেন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চকরিয়া ও পেকুয়া থেকে আসা পাইকারদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীরাও শসা কিনছেন।

চট্টগ্রাম থেকে শসা কিনতে আসা রফিক মিয়া বলেন, পেকুয়ার এই এলাকার শসার চাহিদা বেশি। আকার ও স্বাদ ভালো হওয়ায় পাইকাররা সহজেই কিনে নিতে পারেন। তাই প্রায় প্রতি সোমবার তিনি এখানে শসা কিনতে আসেন। তবে পরিবহনব্যবস্থা ভালো হলে আরও বেশি পাইকার আসতেন।

কৃষি কার্যালয়ের হিসাবে, শসার পাইকারি বাজারমূল্য কেজিপ্রতি ৩০ টাকা। মালগাড়া এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ হাজার কেজি বা ১৫ টন শসা তোলা হয়। এক মৌসুমে ৩০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত শসা সংগ্রহ করা যায়। সে হিসাবে ৩০ দিনে প্রায় ৪৫০ টন এবং ৪০ দিনে প্রায় ৬০০ টন শসা উৎপাদন হয়। কেজিপ্রতি ৩০ টাকা হিসাবে ৪৫০ টন শসার বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা। আর ৬০০ টন শসার বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা।

শসা চাষ শুধু কৃষকের আয়ই বাড়ায়নি, তৈরি করেছে নতুন কর্মসংস্থানও। কয়েকশ পুরুষ ও নারী শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করেন। খদিজা বেগমের স্বামী সাত বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। দুই সন্তান নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল তাঁর। শসার ক্ষেতে কাজ শুরু করার পর সেই পরিস্থিতি বদলেছে। খদিজা বলেন, শুরুতে দিনে ৩০০ টাকা মজুরি পেতেন। এখন কাজভেদে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পান। তাঁর মতো আরও কয়েকশ নারী এই এলাকায় শসার ক্ষেতে কাজ করেন।

 

আরও পড়ুন

×