ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ই-বাস চালুর জন্য দ্রুত চার্জিং অবকাঠামো চান উদ্যোক্তারা

ই-বাস চালুর জন্য দ্রুত চার্জিং অবকাঠামো চান উদ্যোক্তারা
×
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৯ | আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে পরিবেশবান্ধব, আধুনিক ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ইলেকট্রিক বাস (ই-বাস) চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রাথমিক ধাপে ব্যাটারি বিনিয়োগের মুনাফা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড়, কম সুদে ঋণ সুবিধা, সরকারি আর্থিক প্রণোদনা বা ভর্তুকি এবং ই-বাসের জন্য পৃথক যৌক্তিক ভাড়া কাঠামো, ই-টিকিটিং চালু ও সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হকের সভাপতিত্বে সম্প্রতি বিভাগের সভাকক্ষে ‘বেসরকারি খাতে ইলেকট্রিক বাস চালুকরণ’ সংক্রান্ত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভায় এসব বিষয়ে উঠে আসে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো চিঠিতে সভার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সভায় অংশীজনদেরকে লিখিত মতামত ও সুপারিশ পাঠাতে বলা হয়েছে। প্রাপ্ত মতামত ও সুপারিশগুলো সমন্বিত করে পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করা হবে। 

ভাড়া ও রুট নির্ধারণে নীতিমালার দাবি
সভায় ই-বাসের টেকসই চালুকরণে আমদানিকারকদের দ্রুত সমন্বিত ও পৃথক প্রস্তাবনা প্রেরণের নির্দেশ দেন সড়ক বিভাগের সচিব ড. জিয়াউল হক।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম এবং কার্যকরী সভাপতি এম এ বাতেন বলেন, ‘ব্যাটারির মান, চার্জিং অবকাঠামো এবং ব্যাটারির পুনর্ব্যবস্থাপনা মূল্যায়ন ছাড়া সরাসরি ই-বাস চালানো কঠিন।’ প্রচলিত ডিজেল ও সিএনজি বাসের সঙ্গে ই-বাসের বিনিয়োগ ও পরিচালন ব্যয়ের পার্থক্য তুলে ধরে তারা জানান, ‘চড়া সুদে ঋণ নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বিনিয়োগ ফেরত পাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তাই ই-বাস ও ই-এসি বাসের জন্য আলাদা যৌক্তিক ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ এবং শুল্ক ও ভ্যাট ছাড়ের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।’

ই-বাসের প্রাথমিক ক্রয়মূল্য বেশি হওয়াতে বিনিয়োগের রিটার্ন ফেরানো নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে সরকারি ভর্তুকি প্রদানের প্রস্তাব রাখেন বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ফারুক তালুকদার সোহেল।  

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু পণ্য পরিবহনেও ই-যানবাহনের ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

স্বল্প সুদে ঋণের সুযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম জানান, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে সর্বোচ্চ সাত শতাংশ সুদে বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ই-বাস আমদানিকারক ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এই স্বল্প সুদের ঋণের আওতায় আনা সম্ভব।’

চার্জিং স্টেশন ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা
উত্তরা মোটর্সের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ ফারুক-ইয়া-আজম বলেন, ‘চার্জিং অবকাঠামোতে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে এবং বিদ্যুৎ রুট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ে মন্ত্রণালয়, অটোমোবাইল শিল্প, বিআরটিএ ও বিআরটিসিসহ সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন।’

আকিজ ভেঞ্চার্সের প্রতিনিধি জানান, ‘দেশের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক ফাস্ট চার্জিং স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ পাশাপাশি বিদ্যুৎ নির্ভরতা কমাতে চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।

ইফাদ অটোর্সের প্রতিনিধি হেলাল খান বলেন, ‘ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিভিন্ন রুটে ই-বাস পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ক্রয়মূল্য বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক।’ তিনি ঢাকায় বাণিজ্যিকভাবে সরাসরি না গিয়ে প্রথমে পরীক্ষামূলক পরিচালনা করার সুপারিশ করেন।

র‍্যাংগস মোটর্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানা রউফ চৌধুরী জানান, ‘কেবল সরাসরি প্রস্তুতকৃত বাস আমদানির বদলে স্থানীয়ভাবে সংযোজন শক্তিশালী করতে হবে।’     
রানার গ্রুপের হেড অব কর্পোরেট আমিনুর রহমান জানান, ‘স্থানীয় অটোমোবাইল শিল্পের বিকাশে আট থেকে ১০টি শীর্ষ মোটরযান আমদানিকারক ও বডি বিল্ডার্স প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে যৌথ ও সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন।’

আরএফএল গ্রুপের হেড অব বিজনেস তাইমুর হাসিব এবং নাসির সিনটেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাছিম বিশ্বাস ব্যাটারি ও মোটরের ওপর বিশেষ শুল্ক সুবিধা, সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ও চার্জিং স্টেশনের জন্য ফিডার সুবিধা তৈরির আহ্বান জানান। 

প্রথম পর্যায়ে ঢাকার অভ্যন্তরে এবং পরবর্তী সময়ে দূরপাল্লার রুটে ই-বাস চালুর প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা আধুনিক ডিজিটাল টিকিটিং ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত চার্জিং নেটওয়ার্কের ওপর জোর দেন।

র‍্যাংকনের প্রতিনিধি সজল জানান, পরিবেশ দূষণ কমাতে ধাপে ধাপে ইউরো-১ ও ইউরো-৩ ইঞ্জিন প্রতিস্থাপন করে ই-যানবাহন চালু করা উচিত। 

কারিগরি কমিটি ও নীতিগত সিদ্ধান্ত
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আনিসুর রহমান জানান, প্রাথমিক ক্রয়মূল্য বেশি হলেও ই-বাসের পরিচালন ব্যয় অনেক কম। সরকারি সংস্থাগুলোর ক্রয় তালিকায় ই-বাস অন্তর্ভুক্তির নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বুয়েট ও এমআইএসটির বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে উপযুক্ত কারিগরি মানদণ্ড নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে।

আরও পড়ুন

×