ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সেমিনারে বক্তারা

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইন নয়, বদলাতে হবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইন নয়, বদলাতে হবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
×
×

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে ঢাবির সিনেট ভবনের অ্যালামনাই ফ্লোরে সেমিনার

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৫০ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৫:২৫

মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার সমাধান শুধু আইন প্রয়োগ, হাসপাতাল নির্মাণ কিংবা চিকিৎসক বাড়িয়ে সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, প্রশিক্ষিত জনবল এবং পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ। মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তার সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের অ্যালামনাই ফ্লোরে আয়োজিত জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, সামাজিক সমস্যার গভীরে না গিয়ে শুধু আইন বা চিকিৎসার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। 

সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, কোনো ঘটনা ঘটার পর ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া কিংবা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। কিন্তু এর পাশাপাশি কেন ঘটনাটি ঘটল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তার পরিবারের ওপর এর কী প্রভাব পড়ল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী করা দরকার—সেসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করতে হবে। তা না হলে কত কারাগার, হাসপাতাল কিংবা চিকিৎসক বাড়ানো হলো, তাতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

তিনি বলেন, সামাজিক সমস্যার সমাধানে সমাজের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বাল্যবিবাহের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, একটি সভ্য সমাজে বাল্যবিবাহের উচ্চ হার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইন থাকলেও মানুষের মানসিকতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন না এলে এ ধরনের সমস্যা দূর করা কঠিন। অল্প বয়সে বিয়ে মা ও শিশুর শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে হবে।

অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যার ক্ষেত্রে মানুষের মনোজগতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। এ জন্য মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পরিবেশ, পারিবারিক পরিস্থিতি ও সামাজিক সম্পর্ক মানুষের আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা বুঝে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নতুন উদ্যোগ
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও মানসিক চাপে ভুগলেও চিকিৎসাসেবার আওতায় আসেন না। গুরুতর রোগীদের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে সেবা থাকলেও তুলনামূলক কম তীব্রতার দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভোগা বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে বড় বাধা প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব। আবার যাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ রয়েছে, তাদের কাজ করার উপযুক্ত ক্ষেত্রও পর্যাপ্ত নয়। সরকার ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কারদের পেশাগত দক্ষতা কাজে লাগাতে চায়। এ বছর একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখান থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকারের আগামী চার বছরের মেয়াদে আরও বড় পরিসরে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য, ডিজিটাল আসক্তি, মা-বাবার বিচ্ছিন্নতার কারণে শিশুদের মানসিক সংকট এবং ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা ও পারিবারিক মানসিক আঘাত মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সন্তান জন্মের আগে ও পরে মায়েদের বিষণ্নতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সন্তান জন্মের পর একজন মা মানসিক চাপে থাকলে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে অনেক সময় সহানুভূতির পরিবর্তে কটূক্তি শুনতে হয়। ‘আমাদের তো সাত-আটটি সন্তান হয়েছে, তোমাদের একটি সন্তান হলেই এত কষ্ট কেন’—এ ধরনের মন্তব্য নতুন মায়ের মানসিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এসব বিষয়ে পরিবার ও সমাজের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।

ডিজিটাল আসক্তি প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু কিশোর-কিশোরী নয়, বড়রাও মুঠোফোনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল আসক্তি কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন উদ্বেগ বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তাই এ সমস্যা মোকাবিলায় সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জরুরি।

তিনি আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। গুরুতর মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কারদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সেবার কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষের অভিজ্ঞতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্থ-সম্পদ ও বস্তুগত সাফল্য থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, সম্পর্ক, শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক অংশগ্রহণের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে শিক্ষা, গবেষণা, নীতি প্রণয়ন ও সেবার পরিকল্পনা করার সময় সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক কষ্টে থাকা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা মনোযোগ দিয়ে শুনলে কোথায় সেবা কার্যকর হচ্ছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কীভাবে সেবাকে আরও মানবিক ও সহজলভ্য করা যায়, তা বোঝা সম্ভব।

উপাচার্য আরও বলেন, সমাজে অবহেলিত হওয়া কিংবা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই মানসিক কষ্টের কথা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন। সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

সেমিনারে বক্তারা মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রশিক্ষিত জনবলের কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন।

আরও পড়ুন

×