ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বিসিএস: রাজনৈতিক তালাশের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক

অভিমত

বিসিএস: রাজনৈতিক তালাশের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক
×
×

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন ভবন। ছবি: সংগৃহীত

শরিফুল হাসান

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৫৪ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

৪৪তম বিসিএসের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহকারী পরিচালক হিসেবে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি চাকরিতে যোগ দেন মো. নূরে আলম। তাঁর স্বপ্ন ছিল পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেওয়া। কারণ, আনসার ক্যাডারে যোগ দেওয়ার আগে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে তিনি পুলিশ ক্যাডার পান। ওই বিসিএসের গেজেট বা প্রজ্ঞাপন হয়েছে গত বুধবার। কিন্তু প্রজ্ঞাপনে তাঁর নাম নেই।

ভীষণ হতাশ নূরে আলম আক্ষেপ করে বললেন, ‘প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কী তথ্য উঠে এলো যে আমাকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হলো? আমার অপরাধ কী? আমি বিশেষ কোনো সুবিধা চাই না। চাই ন্যায়সংগত মূল্যায়ন।’

আরেক প্রার্থী শুভ্র দেবনাথের বাবা-মা দুজনই স্কুলশিক্ষক। আগামী বছর তাদের অবসরে যাওয়ার কথা। সিলেট মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস দিয়েছেন শুভ্র। ৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু গেজেটে তাঁর নাম নেই। 

৪৬তম বিসিএসে তিনি পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এখন সেই গেজেট নিয়েও দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে। শুভ্র বললেন, ‘দীর্ঘদিনের সাধনার পর গেজেটে নাম না দেখে চরম হতাশায় নিমজ্জিত। আমার অপরাধটা কী?’

একই আক্ষেপ ইফতেখারুল ইসলামেরও। ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী সার্জন হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়ে বর্তমানে নাটোরে কর্মরত তিনি। রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করা এই চিকিৎসক ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তাঁর ইচ্ছা প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়া। কিন্তু প্রকাশিত গেজেটে তাঁর নাম নেই। হতাশা প্রকাশ করে বললেন, ‘কী অপরাধ আমার?’

নূরে আলম, শুভ্র দেবনাথ কিংবা ইফতেখারুল ইসলামের মতো প্রার্থীদের প্রশ্ন এখন একই। বুধবার রাত এবং বৃহস্পতিবার সারাদিন বাদ পড়া প্রার্থীদের অনেকে খুদেবার্তা পাঠিয়েছেন। ফোনে তাদের হতাশার কথা জানিয়েছেন।

শরিফুল হাসান। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

৪৫তম বিসিএসে মোট আবেদন করেছিলেন প্রায় তিন লাখ ৪৬ হাজার প্রার্থী। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। এতে বিভিন্ন ক্যাডারে এক হাজার ৮০৭ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়।

এর পর প্রায় এক বছর ধরে পুলিশ আর গোয়েন্দা যাচাই-বাছাইয়ের পর গেজেট প্রকাশ করা হলো। এতে এক হাজার ৭০২ প্রার্থীর নাম রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ জন স্বেচ্ছায় স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেননি বলে জানা গেছে। সেই হিসাবে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও অন্তত ৫৫ জন গেজেট থেকে বাদ পড়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। 

বাদ পড়া প্রায় সবাই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অসাধারণ ফল করেছেন। কেউ বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন বা সরকারি-বেসরকারি চাকরি করছেন সুনামের সঙ্গে। কিন্তু গেজেটে নাম না থাকায় তারা চরম হতাশ। অধিকাংশই বলেছেন, কখনও কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। কেউ কেউ হলে থাকার জন্য ছাত্রলীগের রাজনীতিতে থাকলেও জুলাই-আগস্টে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে তরুণদের সঙ্গে রাজপথে ছিলেন। তাদের ভাষ্য, কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা নেই। তারপরও তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ চার বছরের অপেক্ষা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং লাখ লাখ প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর এভাবে বাদ পড়ায় তারা ভেঙে পড়েছেন। অনেকেরই মনে হচ্ছে, তাদের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। বাদ পড়ারা জানতে চান, কেন তাদের বাদ দেওয়া হলো? বিসিএসে নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার নামে এই অপচর্চা আর কতদিন চলবে?

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ৪৫তম বিসিএসই প্রথম সাধারণ বিসিএস, যার গেজেট প্রকাশ করা হলো। এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ৪৯তম বিশেষ বিসিএস শিক্ষার গেজেট প্রকাশ করা হয়। ওই বিসিএসে মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অধিকারীসহ মোট ৫৭ প্রার্থীর নাম গেজেট থেকে বাদ পড়েছিল। পরে তাদের মধ্যে ৪০ জনের গেজেট প্রকাশ করা হয়।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ৪৩তম, ৪৪তম ও ৪৮তম বিসিএসের গেজেট প্রকাশ করা হয়। প্রতিটি বিসিএসেই রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের নামে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি প্রশিক্ষণ শেষে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ৪১তম বিসিএসের ছয় সহকারী পুলিশ সুপারকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ৪৩তম বিসিএসেও একই ঘটনা ঘটেছে, যেটি ছিল নজিরবিহীন।

কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ৩৪তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত এক তরুণীর নানা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর পরিবারের কেউ রাজনীতি করেন না। কিন্তু গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর মা দুবার বিএনপির সমর্থনে উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ ওই নারী দুবারই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। এই তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁর গেজেট প্রকাশ করা হয়নি।

চট্টগ্রামের এক প্রার্থীর বাবা বিএনপির সমর্থক ছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁকে একাধিক মিথ্যা মামলায় আসামি করা হয়। পরে তাঁর বাবা মারা যান। কিন্তু বাবার বিরুদ্ধে থাকা ওই মামলাগুলোর সূত্র ধরে ছেলের নিয়োগ আটকে যায় বিসিএসে।

৩৮তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে মনোনীত কক্সবাজারের একজনের বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু ছেলেটির নামের শেষে ‘সাঈদী’ থাকায় তাঁর নিয়োগ আটকে যায়। তাঁর এক আত্মীয়, যিনি ওই নিয়োগ ঠেকাতে চেয়েছিলেন, তিনি গোয়েন্দাদের অসত্য তথ্য দিয়েছেন।

এখনও তুচ্ছ কারণে প্রার্থীদের নিয়োগ আটকে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে। বগুড়ার এক প্রার্থী, যিনি ৪৫তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, তিনি জানিয়েছেন, তাঁর পরিবারের কেউ কখনও রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের এক নেতার সঙ্গে তাঁর নামের মিল রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, নামের এই মিলের কারণেই হয়তো ভুলবশত তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করা তানভীর হোসেন ৪৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু গেজেটে তাঁর নাম নেই। তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি মামলা তো পরের কথা, জীবনে কোনো দিন কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করিনি। কী অপরাধে বিসিএস হলো না, তা আমার জানা নেই।’

শাহীনুর রহমান নামের আরেকজন জানান, তিনি ৪১তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই, রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডেও জড়িত ছিলেন না। তারপরও কেন তাঁকে বাদ দেওয়া হলো, তা বুঝতে পারছেন না। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এই প্রার্থীরও প্রশ্ন– অপরাধটা কী?

কয়েকজন জানিয়েছেন, তারা জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। তারা বাদ পড়েছেন। এসব ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের প্রতি অবিচার নয়; রাষ্ট্রের নিয়োগ ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিতদের বিষয়ে সাংবাদিক হিসেবে একাধিকবার কথা বলেছি সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের সঙ্গে। তিনি প্রতিবার বলতেন, ‘ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া একজনকেও আটকে দেওয়া ঠিক নয়। এটা অন্যায়। এটা অনৈতিক চর্চা। এই সংস্কৃতি বন্ধ করা উচিত।’

পরবর্তী সময়ে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। দুঃখজনকভাবে তিনি যে সময়ে সরকারে ছিলেন, সেই সরকারেও একই ঘটনা ঘটেছে। 

গত ১ অক্টোবর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, নিয়োগের আগে পুলিশ যাচাই একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি বৈষম্য করা হবে না। ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বাদ দেওয়া হচ্ছে– এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে বৈষম্য করবে না। আমরা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছি।’ 

কিন্তু ৪৫তম বিসিএসের গেজেটে ৫৫ জন বাদ পড়লেন। ফৌজদারি অপরাধ না থাকলে ৪৫, ৪৩ থেকে শুরু করে প্রতিটি বিসিএসে বাদ পড়াদের ফের গেজেট প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে মেধার মূল্যায়ন করতে হলে এই চর্চা বন্ধ করা জরুরি। রাজনৈতিক রং খোঁজার এই চেষ্টা কোনো মঙ্গল ডেকে আনবে না। ‘অজ্ঞাত কারণে নিয়োগবঞ্চিত’ করা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কাউকে বাদ দিলে তাঁকে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে হবে।

শুধু নিয়োগের আগে নয়; সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কোনোভাবেই সরকারি চাকরিতে যোগ্যতা কিংবা অযোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। একজন কর্মকর্তার নিয়োগ, পদোন্নতি ও পেশাগত মূল্যায়নে বিবেচ্য হওয়া উচিত তাঁর মেধা, সততা, দক্ষতা ও যোগ্যতা। কাজেই বাদ পড়া সবার গেজেট হোক। আর রাজনৈতিক তালাশের এই অপসংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হোক!

৪৩তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছিল ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর। এর পর আবেদন, প্রিলিমিনারি, লিখিত, ভাইভাসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ৪৩তম বিসিএস থেকে দুই হাজার ৮০৫ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করেছিল পিএসসি। যাচাই-বাছাই শেষে ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গেজেট প্রকাশ করা হয়। তখন নেতিবাচক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণে ৫৪ জন বাদ পড়েন। বাকি দুই হাজার ৬৪ জনকে গেজেটভুক্ত করে ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর চাকরিতে যোগ দিতে বলা হয়।

কিন্তু ২৮ অক্টোবর রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যোগদানের তারিখ পিছিয়ে ১ জানুয়ারি নির্ধারণ করে। এর কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। বরং আবার পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই শুরু হয়।

ওই যাচাই শেষে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের আমলে প্রকাশিত আগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে। একই সরকারের আমলে একটি বিসিএসের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে আবার প্রজ্ঞাপন প্রকাশের এমন নজির আগে ছিল না।

দ্বিতীয়বার প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে ২২৭ জনকে বাদ দেওয়া হয়, যা কোনো বিসিএসে বাদ পড়ার সংখ্যার দিক থেকে রেকর্ড। তাদের মধ্যে ১৬২ জনের প্রজ্ঞাপন পরে প্রকাশ করা হলেও ৬৫ জনের হয়নি। সরকারের নানা দপ্তরে ঘুরলেও কেন তারা যোগ দিতে পারেননি, সেই উত্তর পাননি।

কারণ যে সেই রাজনৈতিক, সেটি বোঝাই যায়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ৪৩তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও পুলিশ ক্যাডারের অন্তত আটজন, প্রশাসন ক্যাডারের তিনজন, পররাষ্ট্র ক্যাডারের দুজন ও অডিট ক্যাডারের দুজনসহ মোট ১৫ জনকে চাকরি শুরুর পরপরই বাদ দেওয়া হয়। চাকরিতে যোগদানের পর এভাবে একসঙ্গে এতজনকে বাদ দেওয়ার নজির আগে ছিল না।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকাশিত ৪৪তম ও ৪৮তম বিসিএসেও একই ঘটনা ঘটে। ৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জনকারীসহ মোট ২০ জন এবং ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে ২৭ জন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীকে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন থেকে বাদ দেওয়া হয়।

গত ২ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক হয়রানি ও বৈষম্যের অভিযোগ তুলে অবিলম্বে নিয়োগের দাবি জানান ৪৩তম, ৪৪তম ও ৪৮তম বিসিএসে বাদ পড়া প্রার্থীরা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছিলেন ৪৩তম বিসিএসে গেজেটবঞ্চিত প্রার্থী কানজিলাল রায় জীবন। তিনি বলেন, একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কারণ জানতে চেয়েও তারা সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাননি।

বিসিএসে রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার এই সংস্কৃতি নতুন নয়। প্রতিটি সরকারের আমলেই কমবেশি ঘটেছে। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত অন্তত ২৬৫ জন প্রার্থীর নিয়োগ আটকে ছিল। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা নেতিবাচক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কারণ দেখিয়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তাদের সবার নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘ হতাশা ও অপেক্ষার পর তারা চাকরিতে যোগ দেন।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের পুরোনো অপচর্চা বন্ধ হয়নি। সরকার বদলেছে, কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব নিয়ে অভিযোগের অবসান ঘটেনি।

এভাবে যে প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়, তার কি আদৌ কোনো আইনি ভিত্তি আছে? বিধি বলছে, বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে গেজেট প্রকাশ করা হবে। সাধারণত পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এই যাচাই করে থাকে। অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকেও এ কাজে যুক্ত করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই যাচাইয়ে আসলে কী দেখা হয়?

বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের প্রাক্‌-যাচাই ফরমে ১৬ ধরনের তথ্য দিতে হয়। সাধারণ তথ্যের পাশাপাশি কোনো মামলায় গ্রেপ্তার, অভিযুক্ত কিংবা দণ্ডিত হয়েছেন কিনা, তাও জানতে চাওয়া হয়। এসব তথ্য যাচাই করে পুলিশ প্রতিবেদন দেয়। এর বাইরে অন্য কোনো তথ্য যাচাই করার কথা না থাকলেও বছরের পর বছর প্রার্থীর পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা হচ্ছে। সংকটের শুরু এখানেই। বিশেষ করে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে না, তাদের সঙ্গে প্রার্থীর বা তার পরিবারের কারও সম্পর্ক দেখাতে পারলেই বাদ দেওয়া সহজ হয়ে যায়। আইনত, প্রার্থীর ফৌজদারি অপরাধ বাদে আর কোনো কিছু যাচাই করার কথা নয়।

আরও পড়ুন

×