হাওরের কান্না (৪)
প্রাণ হারাচ্ছে টাঙ্গুয়া
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ শিকার করছে জেলেরা - সমকাল
জাহিদুর রহমান, টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে ফিরে
প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১২ | আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩০
'আমরা সবাই হাওরবাসী/হাওর ছাড়া বুঝি না/টাঙ্গুয়ার হাওর মরতে আমরা দেব না।' ডিঙি নৌকায় বসে শিশু তামিম গানের সুরে এভাবেই তুলে ধরে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের মুমূর্ষু দশার কথা। জীবিকার টানে এ জলরাশিতে ভেসে বেড়ানো ১১ বছরের শিশুটিও বুঝে গেছে, হাওর ছাড়া জীবন অন্ধকার।
প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি কেন এখন মরণের পথে? এই প্রশ্ন করেছিলাম ৬৫ বছর বয়সী রেনু মিয়াকে। ডিঙি নৌকায় হাওরে চা বিক্রি করেন তিনি। ২০ বছর আগের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বললেন, 'টাঙ্গুয়ার আকাশ কালো করে পাখি আসত। বড় বড় মাছ লাফ দিয়ে নৌকায় পড়ত। ছিল সারি সারি বন। কত রকম জীবের সমাহার ছিল তার কোনো হিসাব নেই। এখন এর কিছুই নেই।'
শিশু তামিমের গান আর রেনু মিয়ার কথায় স্পষ্ট বোঝা গেল টাঙ্গুয়ার হাওরের বাতাসে এখন চাপা কষ্ট। এ ব্যাপারে বিশদ জানতে আমরা নৌকায় চেপে বসলাম। কষ্টের যোগ-বিয়োগের অঙ্ক মেলাতে বেশি দূর যেতে হলো না। একটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল হাওরের মাঝখানে অনেক ডিঙি নৌকা, কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরছেন শত শত জেলে।
স্থানীয়রা জানান, কারেন্ট জাল, কোনাজাল, ভেটজাল, লাঠিজালসহ বিভিন্ন নামের জাল দিয়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ নৌকা এখানে মাছ ধরে। মাটি ঘেঁষে জাল টানার কারণে হাওরের নিচের জলজ প্রাণ এবং উদ্ভিদ নষ্ট হচ্ছে। শুস্ক মৌসুমে রাসায়নিক দিয়েও মাছ ধরা হয়। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পীযূষ পুরকায়স্থ টিটু বলেন, আগে টাঙ্গুয়ার হাওরে ১৫০ থেকে ১৭৫ প্রজাতির মাছ ছিল। এখন এর প্রায় ৩০ ভাগই দেখা যায় না।
আমরা আরও এগিয়ে যাই। পাশেই সবুজের হাতছানি। বনে নামতেই টাঙ্গুয়ার ক্ষত আরও স্পষ্ট হলো। ভেতরে শুধু গাছের গোড়ালি। জ্বালানি চাহিদা মেটাতে নলখাগড়া, বনতুলসী, চাইল্লাবন, হিজল, করচ গাছ নৌকা বোঝাই করে কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নির্বিঘ্নে। সম্প্রতি গাছ কাটার বেশ কয়েকটি ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করেছেন পীযূষ পুরকায়স্থ। তিনি সমকালকে বলেন, পুরোনো নলবনসহ বেশ কিছু বন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এক শ্রেণির পাখিশিকারি অতিথি পাখি নিধন করছে। বেশ কয়েকটি হোটেলে পাখির মাংসও বিক্রি হয়।
কয়লা উত্তোলনে হাওর ভরাট : হাওরের কিছু স্থানে দেখা যায় কয়লা ও পাথরবাহী নৌযান। এর শ্রমিকরা জানান, হাওরের কিছু পাড়ে কয়লা উত্তোলনের জন্য মেঘালয় পাহাড়ে ডিনামাইটের বিস্টেম্ফারণ ঘটানো হয়। এর প্রলয়ঙ্করী শব্দে প্রকম্পিত হয় চারপাশ। এতে পাহাড়ি ঢলে ওপর থেকে নেমে আসা বালির কারণে ভরাট হচ্ছে হাওর ও তৎসংলগ্ন নদী।
পর্যটকদের অসতর্কতা : ঘুরতে ঘুরতে আঁধার নেমে আসে। রাত প্রায় ৯টার দিকে হঠাৎ দূরে মাইকে গানের শব্দ ও আলোর ঝলকানি দেখা গেল। সেটি আসলে টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার। সেখানে পর্যটকবাহী অনেক ইঞ্জিনচালিত বাহন। আবিদা অ্যান্ড তাহা টাঙ্গুয়া প্রমোদতরী নামে বিলাসবহুল নৌযানে পর্যটকরা রান্নার কাজে ব্যস্ত। ভেতরে কেবিন, দুটি খাট, তিনটি টয়লেট, ৩০০ লিটার পানি ধারণক্ষমতার ট্যাঙ্কও রয়েছে। পুরো জাহাজে আলো ঝলমল করছে। নৌযানটির ছাদে একসঙ্গে দেড়শ' মানুষ অনুষ্ঠান করতে পারে। এখানে গানের জলসারও আয়োজন হয়।
এছাড়া আদিবা অ্যান্ড আদিব নৌপরিবহন, টাঙ্গুয়া নৌপরিবহন, মোহনা নৌপরিবহন, মুক্তা মণি নৌপরিবহনসহ ছোটবড় অন্তত শতাধিক নৌযান টাঙ্গুয়ার বুকে চলছে। বেসরকারি একটি জরিপে দেখা গেছে, ছুটির দিনে এখানে দৈনিক অন্তত ১০ হাজার পর্যটক আসেন, এর ৮০ ভাগই নৌকায় রাত কাটান। এলাকাবাসী জানান, পর্যটকরা প্লাস্টিকের থালা, পলিথিন, চিপস-চানাচুরের প্যাকেটসহ প্রকৃতিবিনাশী উপকরণ ছুড়ে ফেলে দেন হাওরে। সংরক্ষিত এলাকায় উচ্চ শব্দে মাইকও বাজানো হয়। এতে জলজ-স্থলজ জীবের ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান পরিবেশবিদরা।
সম্প্রতি ড্রোন থেকে তোলা ছবিতে (ইন্টারনেটে পাওয়া) দেখা গেছে, টাঙ্গুয়ার হাওরের তলদেশে নানা বর্জ্য। পাখি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গত কয়েক বছরে টাঙ্গুয়ায় পাখি কমেছে ৮০ শতাংশ। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের জরিপে দেখা যায়, ২০১৫ সালে এখানে প্রায় দুই লাখ অতিথি পাখি এলেও ২০১৮ সালে আসে মাত্র ৫০ হাজার। অথচ এর আগে ২০০২ সালে এ হাওরে পাঁচ লাখের বেশি শুধু জলচর পরিযায়ী পাখি গুনেছেন বলে জানান ক্লাবটির প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।
অবহেলা ও অপতৎপরতা : টাঙ্গুয়ার হাওরকে ১৯৯৯ সালে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা ও ২০০০ সালে রামসার সম্মেলনে 'বিশ্ব ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০০৩ সাল থেকে ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে হাওরের নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন। তখন থেকেই শুরু হয় নানান প্রকল্প। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আনসার বাহিনী হাওর পাহারা দিতে থাকে। স্থানীয়রা বলছেন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিলেই চুপ থাকে।
ম্যাজিস্ট্রেট ১৫ কিলোমিটার দূরে টেকেরঘাটে থাকায় হাওর অনেকটাই অরক্ষিত। স্থানীয়দের নিয়ে গঠিত সমবায় সমিতির কমিটিতে কিছু লোভী লোককে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন আইইউসিএনের সমাজভিত্তিক টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এটি কার্যত অরক্ষিত। এছাড়া নিয়ম লঙ্ঘন করে টাঙ্গুয়ার হাওরের হানিয়া ও কলমা বিল ইজারা দেওয়া হয়েছে।
টাঙ্গুয়ার হাওর বিপন্ন হওয়ার পেছনে রয়েছে আরও কিছু পুরোনো গল্প। তাহিরপুরের টেকেরঘাটে ১৯৬৬ সালে স্থাপিত চুনাপাথর খনি বন্ধ করে দেওয়া হয় প্রায় দুই দশক আগে। এতে এখানে কর্মরত প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করায় হাওরকেই জীবিকা নির্বাহের পাথেয় বানান তারা। এত আঘাত সয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর নিজেকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবে- সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষা মঞ্চের সমন্বয়ক ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে মাছ ধরা ও পর্যটনসহ সব ব্যবসায়িক কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করে কঠোর নজরদারি করা দরকার। বিকল্প কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানিরও ব্যবস্থা করতে হবে। ভরাট হওয়া হাওর খননের পাশাপাশি থামাতে হবে পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা বালির স্রোত।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ সমকালকে বলেন, আনসার সদস্যদের অনিয়ম
নিয়ে তিনি কখনও অভিযোগ পাননি। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেবেন। তিনি
বলেন, এত বড় হাওরে মাত্র একজন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। দুর্গম
হওয়ায় এখানে কেউই বেশি দিন থাকতে চান না।
- বিষয় :
- হাওরের কান্না