দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় কোনো ছাড় নয়: ডিসি ফরিদা
বুধবার বিকেলে সাভার উপজেলা পরিষদ হলরুমে শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক প্রস্তুতি বিষয়ক সভায় বক্তব্য দেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৪৬
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। তিনি বলেছেন, পূজামণ্ডপে বিশৃঙ্খলা, উসকানি, মাদক, ইভটিজিং, নারী ও শিশু হয়রানি কিংবা দুষ্কৃতকারীদের তৎপরতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। একই সঙ্গে গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই তা শনাক্ত ও প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার বিকেলে সাভার উপজেলা পরিষদ হলরুমে শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ উপলক্ষে পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক প্রস্তুতি বিষয়ক সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন (বাবু)।
সভায় জানানো হয়, এবার সাভার উপজেলায় মোট ২৩৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সাভার পৌরসভায় ৪৫টি, শিমুলিয়া ইউনিয়নে ৪০টি, ধামসোনা ইউনিয়নে ১৩টি, আশুলিয়া ইউনিয়নে ১১টি, ইয়ারপুরে ১০টি, পাথালিয়ায় ৩০টি, বিরুলিয়ায় ১৪টি, সাভার ইউনিয়নে ৩টি, বনগাঁওয়ে ১২টি, তেতুলঝোড়ায় ২৬টি, কাউন্দিয়ায় ১২টি এবং ভাকুর্তায় ২২টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। আমিনবাজার ইউনিয়নে এবার কোনো পূজামণ্ডপ নেই।
ডিসি ফরিদা খানম বলেন, প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে পূজা উদযাপন ও বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপে বিশেষ নজরদারি, পুলিশ, আনসার, সিআরবি/এসআরবি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বিত দায়িত্ব পালন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে আইপি ক্যামেরা স্থাপন, ভিডিও ধারণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জেবল আইপি ক্যামেরা স্থাপন করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে সংযুক্ত করার কথাও বলেন। স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয়পত্র ও বাহুবন্ধনী নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যাপ্ত নারী স্বেচ্ছাসেবক রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে প্রতিটি মণ্ডপে কমপক্ষে ৫ কেজি ধারণক্ষমতার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পর্যাপ্ত আলো, চার্জার লাইট ও প্রয়োজন অনুযায়ী জেনারেটর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পূজা শুরুর আগেই ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে মণ্ডপগুলোর বৈদ্যুতিক ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনের কথাও জানান তিনি।
গুজব প্রতিরোধে কোনো তথ্য যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার না করার আহ্বান জানিয়ে ফরিদা খানম বলেন, গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে এর উৎস শনাক্ত করে আগেই তা প্রতিরোধ করতে হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে কেউ অপতৎপরতা চালালে দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এই চেতনাকে ধারণ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। আজান ও নামাজের সময় পূজামণ্ডপে মাইক বা বাদ্যযন্ত্রের শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং অন্য ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমা বিসর্জনে নির্ধারিত স্থান ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে ডিসি বলেন, বিসর্জনস্থলে ফায়ার সার্ভিস, নৌপুলিশ ও ডুবুরি দল প্রস্তুত রাখতে হবে। একই সঙ্গে আলোকসজ্জা, পরিচ্ছন্নতা, যানবাহন চলাচল ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিসর্জন শেষ করতে হবে।
পূজামণ্ডপ ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং পূজা শেষে দ্রুত বর্জ্য অপসারণের নির্দেশও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মণ্ডপ ঘিরে মেলা, মাদক, জুয়া, হাউজি কিংবা কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
ডিসি বলেন, পূজার নিরাপত্তা প্রস্তুতি মহালয়া থেকেই শুরু করতে হবে। আগামী ১০ অক্টোবর সকাল ৫টা থেকে মহালয়াকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিমা বিসর্জনের পর পূজামণ্ডপ, মন্দির বা আশপাশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন না করার বিষয়েও নির্দেশনা দেন তিনি।
সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম বা অনুপ্রবেশের কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না। সম্ভাব্য কোনো সমস্যা বা ঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিলেই প্রশাসনকে জানানোর জন্য পূজা উদযাপন কমিটিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সভায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাবের মো. সোয়াইব, সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম, সাভার ও আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা, পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ডিসি ফরিদা খানম বলেন, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা নয়; এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক দায়িত্বশীলতারও বিষয়। নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনে ঢাকা জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।
- বিষয় :
- ঢাকা
- জেলা প্রশাসক