উদ্যোগ
পানির ওপর আশার আশ্রয় কুড়িগ্রামের বন্যা সহনশীল ঘর
বন্যা-সহনশীল ঘরের ভিত্তিমূলে রয়েছে শক্ত কংক্রিটের পিলার, মূল ঘরের দেয়াল ও চালে ব্যবহার করা হয়েছে টেকসই সবুজ রঙের ঢেউটিন।
মারিয়াম নুরসাত
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৫৭
প্রতি বছর বর্ষা এলেই কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের বুকে নেমে আসে এক অজানা আতঙ্ক। উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল আর নদ-নদীর উপচে পড়া জলে নিমিষেই ভেসে যায় ভিটেমাটি, ধূলিসাৎ হয় স্বপ্নের আশ্রয়। বারবার ঘর হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া এই দুর্গত মানুষের পাশে আশা ও স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট (সিজেডএম)। সব হারিয়ে বারবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর এই ক্লান্তিকর লড়াইয়ে চরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান বদলাতেই এই উদ্যোগ 'বন্যা-সহনশীল ঘর'।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজিবপুর উপজেলার কোদালকাঠি এবং মোহনগঞ্জ ইউনিয়নে এই আবাসন অবস্থিত। ঘরগুলো মূলত সিজেডএম-এর প্রকল্পভুক্ত সদস্যদের নিজস্ব জায়গায় তৈরি করা হয়েছে। নদীভাঙন ও বন্যার চরম ঝুঁকির মুখে থাকা এই পরিবারগুলোকে স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতেই এই আয়োজন।
এই উপহার কেবল তাদের জন্যই, যাদের নিজস্ব ঘর নেই কিংবা ঘর থাকলেও তা কোনোভাবেই বাসযোগ্য নয়। প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিতদের চিহ্নিত করতে সিজেডএম-এর নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক পিআরএ পদ্ধতির মাধ্যমে স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে অস্বচ্ছল ও যোগ্য 'মুস্তাহিক' পরিবারগুলোকে এই ঘরের জন্য বাছাই করা হয়।
চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিকূল আবহাওয়া বিবেচনা করে ঘরগুলোর নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথাগত ঘরের মতো ভূমিসংলগ্ন না করে এগুলোকে উঁচুতে পিলারের ওপর স্থাপন করা হয়েছে, যাতে প্লাবনের পানি নিচ দিয়ে অবাধে প্রবাহিত হতে পারে। প্রতিটি ঘর ২ কক্ষ (প্রতি কক্ষের মাপ ১২/১০ ফুট) বিশিষ্ট, যেখানে একটি পরিবারের কমপক্ষে ৪ জন সদস্য স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারেন।
উপাদান ও নান্দনিকতা
বন্যা-সহনশীল ঘরের ভিত্তিমূলে রয়েছে শক্ত কংক্রিটের পিলার। মূল ঘরের দেয়াল ও চালে ব্যবহার করা হয়েছে টেকসই সবুজ রঙের ঢেউটিন। ঘরের সামনে যুক্ত করা হয়েছে একটি চমৎকার বারান্দা এবং ওঠার জন্য কাঠের সুদৃঢ় সিঁড়ি। মাটির ওপর থেকে উঁচুতে ঘর নির্মাণের ফলে নিচ তলার ফাঁকা জায়গাটি দারুণ কাজের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। সাধারণ বন্যায় ঘর সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি স্থানটি গবাদিপশু রাখা, অতিরিক্ত জ্বালানি কাঠ কিংবা গৃহস্থালি জিনিসপত্র সংরক্ষণে ব্যবহার করা যাচ্ছে। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ঘরের ছাদে বসানো হয়েছে সোলার প্যানেল। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠান নয়, চরাঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির আচরণ খুব ভালো করে বোঝেন—এমন স্থানীয় দক্ষ মিস্ত্রিদের মাধ্যমেই পরম যত্নে তৈরি হয়েছে ঘরগুলো।
বাস্তব রূপ নিচ্ছে ১২টি পরিবারের স্বপ্ন
প্রথম পর্যায়ে এমন ১২টি অতিদরিদ্র পরিবারকে এই কাঠামোগত সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। প্রকল্পের সুবিধা ইতিমধ্যেই ঘরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। ১০টি পরিবার তাদের নতুন ঠিকানায় আনুষ্ঠানিকভাবে বসবাস শুরু করেছে। বাকী ২টি ঘর এখনো নির্মাণাধীন। সিজেডএমের ইনসানিয়াত বিভাগের অধীনে এই ঘরগুলো তৈরি। ইনসানিয়াত বিভাগের এজিএম মো: ইছমাইল হোসাইন বলেন: ‘সিজেডএম যখন কুড়িগ্রামের চরাঞ্ছলের মানুষের জীবিকা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ শুরু করে তখন লক্ষ্য করে যে এ অঞ্চলে প্রতিবছর বন্যা হওয়ায় বসত ঘর নষ্ট হয়ে যায় কিংবা বন্যার পানিতে ভেসে যায়। তখন সিজেডএম বন্যা সহনশীল ঘর তৈরি করার পরিকল্পনা করে। আলহামদুল্লিলাহ, একটি কর্পোরেট গ্রুপের আর্থিক সহায়তায় সিজেডএম এরুপ ঘর তৈরি করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আশা করা যায়, এখন আর বন্যা এলে এই পরিবারগুলো আর গৃহহীন হবে ন।’
বন্যা সহনশীল ঘর পেয়ে উৎফুল্ল মেহেরুন্নেসা বলেন: ‘বছরের পর বছর বন্যায় ঘর ভেসে যাওয়ার পর নতুন করে চাল তোলা আমাদের মতো নিঃস্ব মানুষের পক্ষে অসম্ভব ছিল। এই ঘর শুধু আমাদের মাথার ওপর একটা ছাদ দেয়নি, দিয়েছে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর এক টুকরো স্থায়ী ভরসা।’
সাময়িক খাদ্য ত্রাণ বা জরুরি সহায়তার গণ্ডি পেরিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবেলায় এমন উদ্যোগ টেকসই উন্নয়নের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। সিজেডএমের এই আবাসন মডেল শুধু কুড়িগ্রাম নয়, দেশের অন্যান্য বন্যাপ্রবণ চরাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জীবনমান সুসংহত করতে একটি শক্তিশালী দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।