ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মাতারবাড়ী বন্দর: উন্নয়ন নাকি ঋণ ও উচ্ছেদের প্রকল্প?

মাতারবাড়ী বন্দর: উন্নয়ন নাকি ঋণ ও উচ্ছেদের প্রকল্প?
×
×

সাবরিনা রহিম প্রিয়া

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:০৭

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে এক দশক ধরে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রচারণায় এটিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় রূপান্তরকারী বা ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। জাপান সরকারের সংস্থা জাইকার অফিসিয়াল দলিল বিডি-পি১২২-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে একটি বহুমুখী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে লজিস্টিক অপারেশন সহজ করা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা।’ প্রস্তাবনাটি শুনতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও এর পেছনে চারটি বিষয় বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।

ডলারের সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি
 প্রথমেই বলা হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি এলএনজি (লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস) হাবে পরিণত করা হবে। অথচ ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস-আইইইএফএর ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, এলএনজি কোনো সস্তা বা স্থায়ী সমাধান নয়। এর মূল কারণ হলো ‘ডলারের ফাঁদ’। এলএনজির দাম নির্ধারিত হয় মার্কিন ডলারে। ২০২১ সালে প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের দাম যেখানে ৬ ডলার ছিল, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে তা লাফিয়ে ২৫ ডলারে পৌঁছায়। বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার দিয়ে গ্যাস কিনতে গিয়ে দেশের রিজার্ভে সরাসরি টান পড়ে এবং দেশীয় মুদ্রার মান কমতে থাকে।

অচল সম্পদ বা স্ট্র্যান্ডেড অ্যাসেট হওয়ার ঝুঁকি
বিশ্ব এখন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সৌর, বায়ু ও ব্যাটারি স্টোরেজের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ব্লুমবার্গ নিউ এনার্জি ফাইন্যান্স-বিএনইএফের তথ্যমতে, ২০৩০ সালের পরে নবায়নযোগ্য শক্তি এলএনজির চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী হবে এবং ২০৩৫ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এলএনজির চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। তখন মাতারবাড়ীর বিশাল টার্মিনাল ও বন্দরাঞ্চল ব্যবহারহীন হয়ে অলস পড়ে থাকবে, যা অর্থনীতিতে ‘স্ট্র্যান্ডেড অ্যাসেট’ বা অচল সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। অথচ এই অব্যবহৃত পরিকাঠামোর জন্য নেওয়া কোটি কোটি টাকার ঋণের কিস্তি বাংলাদেশকে পরবর্তী ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে টানা শোধ করে যেতে হবে।

বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ও বিদেশি নির্ভরতা 
বাংলাদেশের নিজস্ব তৈরি পোশাকশিল্প ব্যতীত উল্লেখযোগ্য বড় কোনো রপ্তানি খাত নেই। কিন্তু মাতারবাড়ী বন্দরের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা হচ্ছে বছরে ৩০ লাখ টিইইউ (টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট)। বন্দরের পেছনে নিজস্ব কোনো বড় শিল্পাঞ্চল বা শক্তিশালী ‘হিন্টারল্যান্ড’ বা পেছনের ভূখণ্ড গড়ে ওঠেনি। ফলে বন্দরের সুফল বাংলাদেশ পর্যাপ্ত পাবে না। এটি মূলত ব্যবহৃত হবে বিদেশি শিপিং কোম্পানির ট্রান্সশিপমেন্ট বা পণ্য স্থানান্তরের কাজে। জাইকার নিজস্ব ‘এক্স-অ্যান্টে ইভালুয়েশন’ দলিলেও বিষয়টি পরোক্ষভাবে স্বীকার করা হয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগ ও ঋণের দায়িত্ব বাংলাদেশের হলেও মূল সুফল ও পরিচালনা লাভ নিয়ে যাবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো।

ঋণের ফাঁদ 
প্রকল্পটির জন্য জাইকা যে ওডিএ (অফিসিয়াল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স) ঋণ দিচ্ছে, তা মূলত একটি ‘টাইড লোন’ বা শর্তযুক্ত ঋণ। শর্ত অনুযায়ী বন্দর নির্মাণের যন্ত্রপাতি, পরামর্শক, মূল ঠিকাদার সবকিছু জাপান থেকে বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ জাপান ঋণ দিলেও সেই অর্থ সরাসরি নিজেদের দেশীয় ব্যবসা ও ঠিকাদারদের কাছে ফেরত নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে স্থানীয় অর্থনীতি বা শ্রমিকদের অংশ সামান্য।
তদুপরি ঋণের বোঝা ও রাজস্ব ঘাটতির কারণে সার্বভৌমত্ব হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা থাকে, ঠিক যেমন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মাতারবাড়ীর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ একে ‘ডুয়াল ইউজ’ বা দ্বিমুখী ব্যবহারের উপযোগী করা হচ্ছে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক সুবিধার আড়ালে ভবিষ্যতে এটি ভারত মহাসাগরে ভারত ও জাপানের সামরিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি ও রসদ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, যা সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর।

স্থানীয় কৃষি ও মানুষের চরম উচ্ছেদ
অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি সবচেয়ে মানবিক দিক হলো মহেশখালীর উর্বর জমি অধিগ্রহণ। এই প্রকল্পের জন্য মহেশখালীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ চারটি ইউনিয়ন–মাতারবাড়ী, ধলঘাটা, কুতুবজোম ও কালারমারছড়া উচ্ছেদের মুখে পড়েছে। এই এলাকা কোনো অনাবাদি জমি নয়; মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা থেকে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ লবণের জোগান আসে এবং সেখানে শত শত চিংড়িঘের বিদ্যমান। কুতুবজোম ও কালারমারছড়ায় উৎপাদিত বিখ্যাত পান, ধান ও লবণ দেশের কৃষিতে বড় অবদান রাখে।
একই জমিতে পর্যায়ক্রমে লবণ, ধান ও চিংড়ি চাষ করে একজন কৃষক প্রতি একরে বছরে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় করতেন। কিন্তু বন্দর, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নামে ১৪ হাজার একরের বেশি বহু ফসলি জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। অপর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেয়ে ভূমিহীন হয়ে পড়ছেন স্থানীয় কৃষক ও দিনমজুররা। এতে জাতীয় খাদ্য ও লবণের নিরাপত্তায় বড় ধস নামার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
 জাতীয় পর্যায়ে এখনই এই ঋণগ্রস্ত ও উচ্ছেদকেন্দ্রিক প্রকল্প নিয়ে খোলামেলা ও স্বচ্ছ আলোচনা করা জরুরি।

সাবরিনা রহিম প্রিয়া: সংগঠক ও জলবায়ুকর্মী 

আরও পড়ুন

×