ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন

বিতর্কিত কাউন্সিলরদের সম্পদ বেড়েছে

বিতর্কিত কাউন্সিলরদের সম্পদ বেড়েছে
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৪৯

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং এবারও একই ওয়ার্ড থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত আনিসুর রহমানের বার্ষিক আয় প্রায় চারগুণ বেড়েছে। ২০১৫ সালের ডিএসসিসি নির্বাচনে দেওয়া হলফনামায় তার বার্ষিক আয় ছিল ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এবার হয়েছে ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণও বেড়েছে। বিগত নির্বাচনের সময় তার ৩৪ লাখ ১২ হাজার টাকা দামের ফ্ল্যাট ছিল। এবার ৬০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা দামের একটি ফ্ল্যাট হয়েছে। ১৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকার অকৃষি জমি হয়েছে। এছাড়া এখন তার হাতে নগদ টাকা রয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার। বিগত নির্বাচনের আগেও তার কাছে নগদ ৭ লাখ টাকা ছিল। কিন্তু তা ছিল ব্যাংকঋণ।

কেবল আনিসুর রহমানই নন। বিগত সময়ে যেসব কাউন্সিলর নানাভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছিলেন, তাদের প্রায় সবারই সহায়-সম্পত্তির পরিমাণ গত পাঁচ বছরে বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বেশ আগে থেকেই আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলা হচ্ছিল। সেটার তেমন কোনো ছাপ পাওয়া যায়নি। যারা বিতর্কিত হয়েছেন, তাদেরও অনেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, জনপ্রতিনিধি হয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই ফুলেফেঁপে উঠছেন। জনপ্রতিনিধি সেবামূলক পদ হলেও বর্তমানে সেটা লাভজনক পদে পরিণত হয়েছে। এ চিত্রই বারবার দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে গণতন্ত্র ও সুশাসন কেবল নামেই থাকবে, শক্তিশালী হবে না। এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সুখকর নয়।

হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডিএসসিসির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়া ও বর্তমান কাউন্সিলর আশ্রাফুজ্জামান ফরিদের পাঁচ বছর আগে বার্ষিক আয় ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এবার তার বার্ষিক আয় হয়েছে ২৫ লাখ ৪৬ হাজার ২৪০ টাকা। আগে নির্ভরশীলদের কোনো আয় ছিল না। এবার নির্ভরশীলদের আয় হয়েছে ৪৩ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা।

এদিকে এবার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন আলোচিত-সমালোচিত মমিনুল হক সাঈদ ওরফে ক্যাসিনো সাঈদ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে তার নাম আলোচনায় আসে। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে যারা ক্যাসিনো ব্যবসা চালিয়ে অবৈধ আয় করতেন, তার মধ্যে তিনি অন্যতম বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযান শুরুর সময় দেশের বাইরে থাকলেও সম্প্রতি তিনি দেশে ফেরেন। এর আগে গত অক্টোবরে তাকে কাউন্সিলর পদ থেকে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

ক্যাসিনো সাঈদ এবার নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা জমা দিয়েছেন তাতে উল্লেখ করেছেন তার হাতে আছে নগদ ৭১ হাজার ৮৬১ টাকা। তবে তার চেয়ে অন্তত ছয়গুণ বেশি নগদ টাকা রয়েছে তার স্ত্রী ফারহানা আহম্মেদ বৈশাখীর। ফারহানাও একই ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। বৈশাখীর হাতে নগদ আছে ৪ লাখ ৮০ হাজার ৭০২ টাকা।

নির্বাচনী হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৩৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকা রয়েছে ক্যাসিনো সাঈদের। পাঁচ বছর আগে ব্যাংক বা আর্থিক খাতে তার নামে কোনো টাকা ছিল না। ২০১৫ সাল এবং এবারের নির্বাচনী হলফনামা বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, পাঁচ বছরে তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বৈশাখী এন্টারপ্রাইজের মূলধন বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ ৫২ হাজার ১৮৮ টাকা। ২০১৫ সালে ছিল ১ কোটি ২ লাখ ৯৭ হাজার ৯০১ টাকা। তার বার্ষিক আয় ১৮ লাখ ৬৮ হাজার ৯৭৬ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।

হলফনামা অনুযায়ী ২০১৫ সালে সাঈদের কাছে ২ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড ছিল। পাঁচ বছর পরও তাই আছে। তখন ৩ লাখ টাকার আসবাব ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী ছিল। বর্তমানেও তাই আছে। স্বর্ণালঙ্কার আছে ৬০ তোলা। কিন্তু গত নভেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাঈদের বিরুদ্ধে যে মামলা করেছে, তাতে বলা হয়েছে, অসৎ উদ্দেশ্যে নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাসিনো ব্যবসাসহ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা এবং অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার ২৬১ টাকা অর্জন করেছেন সাঈদ।

হলফনামা অনুযায়ী, সাঈদের স্ত্রী বৈশাখীর কোনো স্থাবর সম্পদ নেই। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে জমানো আছে ১৩ লাখ ৮৯ হাজার ৪৭৫ টাকা। ২ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড ও ৩ লাখ টাকার আসবাব ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী আছে। ৫০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার আছে।

এদিকে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন ডিএসসিসির ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজু। এবার তিনি দলীয় সমর্থন না পেলেও জেলে থেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। হলফনামা অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগে বাড়ি ও দোকানভাড়া থেকে কোনো আয় না থাকলেও এবার এই খাতে আয় দেখিয়েছেন তিনি। এই খাত থেকে তিনি বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও তার স্ত্রী ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আয় করেন।

ময়নুল হকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাসী কর্মকাে জড়িত থাকাসহ নানা ধরনের অভিযোগ আছে। তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা আছে। স্বশিক্ষিত এই প্রার্থী ২০১৫ সালের হলফনামায় পেশা উল্লেখ করেছিলেন রাজধানী সুপার মার্কেটের একটি দোকানে তৈরি পোশাকের ব্যবসা। নগদ ৩ লাখ টাকা ছাড়া তখন অস্থাবর কোনো সম্পদ ছিল না তার। স্থাবর সম্পদের মধ্যে ছিল তিনটি দোকান ও একটি ফ্ল্যাট। এখন কারাগারে থাকা এই প্রার্থীর হাতে নগদ কোনো টাকা নেই। তার স্ত্রীর হাতে আছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা।

একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর প্রার্থী ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হুমায়ুন রশিদ জনি, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুর রউফ নান্নু, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রজ্জব হোসেন, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মুজিব সরোয়ার মাসুম, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী হারুন অর রশিদ, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল হাশেম হাসু, ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের জাহাঙ্গীর আলম ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজুল ইসলাম ভাট্টি, ১০ নম্বর ওয়ার্ডের মারুফ আহমেদ মনসুর, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সালাউদ্দিন আহমেদ ঢালী, ২২ নম্বর ওয়ার্ডের তারিকুল ইসলাম সজীব, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবু সাঈদ, ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের আরিফ হোসেন, ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের শহিদ উল্লাহ মিনু ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের হাবিবুর রহমান হাবুরও সম্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে।

আরও পড়ুন

×