ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এআই ক্যামেরার নজরদারিতে ১০ দিনে মামলা কমেছে ৯২%

এআই ক্যামেরার নজরদারিতে ১০ দিনে মামলা কমেছে ৯২%
×

‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালুর প্রথম ১০ দিনে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় মামলা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে

বকুল আহমেদ 

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৪ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১২:১৩

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালুর প্রথম ১০ দিনে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় মামলা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এতে মহাসড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। 

ট্রাফিক আইন অমান্য করা যানবাহন ও চালকের বিরুদ্ধে কার্যকর, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৮ আগস্ট হাইওয়ে পুলিশ এআই ক্যামেরার নজরদারি ব্যবস্থা চালু করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ নারায়ণগঞ্জের মেঘনায় এই প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। প্রথম দিনে স্বয়ংক্রিয় মামলা হয় ৪৪৬টি। পরদিনই নেমে আসে ৪২-এ। দশম দিনে (বৃহস্পতিবার) মামলা হয়েছে মাত্র ৩৪টি। সে হিসাবে ১০ দিনের ব্যবধানে ৯২ দশমিক ৩৩ শতাংশ মামলা কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এআই ক্যামেরার নজরদারি গাড়িচালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়াতে ভালো ভূমিকা রাখছে। 

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা রোধে হাইওয়ে পুলিশের এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগকে চালকরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি তারা বলছেন, শুধু ক্যামেরা বসিয়ে শতভাগ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। এর সঙ্গে সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন, পথচারী চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ছাড়া দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ ধীরগতির যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ফিডার রোড থেকে মহাসড়কে ওঠার সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার গাড়ির চালকদের সতর্ক করা জরুরি। 

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর ও কুমিল্লা অঞ্চলের আওতায়। ঢাকার সাইনবোর্ড থেকে নারায়ণগঞ্জের অংশ গাজীপুর অঞ্চল এবং কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত মহাসড়ক কুমিল্লা অঞ্চল। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, মহাসড়কে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালানোর সুযোগ রয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ১৮ আগস্ট থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দিনে স্বয়ংক্রিয় মামলা সংখ্যা ৬৯৫টি। এর মধ্যে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর দায়ে ৬৫৮টি এবং ৩৭টি উল্টোপথে চালানোর কারণে।

প্রথম দিনে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বয়ংক্রিয় ৪৪৬টি মামলা হয়। এর মধ্যে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর দায়ে ৪১৭টি এবং উল্টোপথে গাড়ি চালানোর অপরাধে ২৯টি মামলা হয়েছে। পরদিন ৪৪৬ থেকে মামলার সংখ্যা ৯০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে আসে। এদিন অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর অপরাধে মামলা হয়েছে ৪২টি। তবে উল্টোপথে গাড়ি চালানোর কোনো ঘটনা শনাক্ত হয়নি। ২০ আগস্ট অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর অপরাধে ২০টি মামলা হয় এবং উল্টোপথের ঘটনা একটি। এর পরদিন অতিরিক্ত গাড়ি চালানোর অভিযোগে ১৯ এবং উল্টোপথে যাওয়ার কারণে দুটি। ২২ আগস্ট ৪২টি এবং এর পরদিন মামলা সংখ্যা ৩৫। ২৪ আগস্ট উল্টোপথে গাড়ি চালানোর অপরাধে একটি এবং অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে ২০টি মামলা হয়। ২৫ আগস্ট মামলার সংখ্যা খুবই কম, মাত্র ১৪টি। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার উল্টোপথে গাড়ি চলাচলের মামলা শূন্যে নেমে আসে। বুধবার অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর অপরাধে মামলা ১৯টি এবং বৃহস্পতিবার ৩৪টি। 

হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, মহাসড়কের প্রতি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন সম্ভব হয় না। কোনো কোনো জায়গায় ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি দেখলে চালক আইন মেনে চলার চেষ্টা করতেন। আবার পুলিশ না থাকলে আইন ভাঙতেন। এআই ক্যামেরার নজরদারির কারণে সড়কে চালকের মধ্যে আইন মানার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে। যে কারণে মামলা কমে আসছে।  

সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিতে গেলে গাড়ির প্রভাবশালী মালিকরা নানাভাবে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করতেন। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ শনাক্তের পর মামলা হওয়ায় মানুষের সেই সুযোগ থাকছে না। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে যানবাহনের নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে মামলার তথ্য পাঠানো হচ্ছে। পরে জরিমানার টাকা পরিশোধ ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়কের দুই পাশে ৪৯০টি খুঁটিতে এক হাজার ৪২৭টি এআই ক্যামেরা যানবাহনে নজর রাখছে। ক্যামেরাগুলো নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে একটি ডেটা সেন্টার ও পাঁচটি তদারকি কেন্দ্রের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ট্রাফিক আইন অমান্য করা গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মহাসড়কে ডাকাতি, ছিনতাইসহ কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তা ক্যামেরায় ধরা পড়বে। 

শৃঙ্খলা ফিরছে মহাসড়কে
শ্যামলী পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক সেলিম রেজা সমকালকে বলেন, এআই ক্যামেরা চালু হওয়ার পর তাদের পরিবহনের সব চালককে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালাতে হবে। অন্যথায় ভিডিও মামলা হলে জরিমানা চালককেই বহন করতে হবে।

হানিফ পরিবহনের চালক শাহেদ সিদ্দিকী সমকালকে বলেন, এআই ক্যামেরা লাগানোর উদ্যোগ খুবই ভালো। তবে মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, সিগন্যাল ব্যবস্থা, ফুট ওভারব্রিজ যথাযথ সংস্কার করতে হবে। পথচারীরা যাতে যত্রতত্র সড়কে উঠে না পড়েন, সে বিষয়ে তাদের সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, সড়কে অটোরিকশা, টমটম ও ব্যাটারিচালিত রিকশা বেপরোয়া চলাচল করে। এ কারণে ঝুঁকিতে পড়তে হয়। 

ইউনিক পরিবহনের চালক মোহাম্মদ হাশেম বলেন, ভিডিও মামলা চালু হওয়ার পর রাস্তায় আগের চেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটারের বেশি গাড়ি চালালে মামলা হচ্ছে। কিন্তু ৮০ কিলোমিটার গতিতে চালালে অনেক যাত্রী দ্রুত চালানোর জন্য চাপ দেন।

এদিকে, হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদ সমকালকে বলেন, ১৮ আগস্ট এআই ক্যামেরা উদ্বোধনের আগে পরীক্ষামূলক চালানো হয়েছে। তখন মামলা সংখ্যা প্রতিদিন চার শতাধিক ছিল। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেও ৪শর বেশি মামলা হতো। তবে এআই ক্যামেরা চালুর পর আমরা দেখছি, প্রতিনিয়ত মামলার সংখ্যা কমছে। প্রথম দিন মামলার যে সংখ্যা ছিল, এর থেকে অনেক কমে এসেছে। এখন মামলার সংখ্যা ৪০-এর নিচে থাকছে।

হাইওয়ে পুলিশপ্রধান বলেন, মামলার সংখ্যা কমার পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে। চালকরা সতর্ক হয়েছে। তারা গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করার কারণে সড়কে শৃঙ্খলা আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×