অভিমত
চমক, উদারতা ও উদাসীনতা
ড. জাহিদ হোসেন
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৯ জুন ২০২২ | ১৪:২৪
সব মিলিয়ে বাজেটে কিছু চমক আছে, কিছু উদারতা আছে এবং আছে কিছু উদাসীনতাও। চমকের মধ্যে একটি হলো তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের মধ্যে আয়করের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য ছিল, সেটিকে দূর করা হয়েছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে এটি বড় বাধা ছিল। এখন পোশাকবহির্ভূত রপ্তানি খাতেও যদি সবুজ কারখানা হয় তাহলে ১০ শতাংশ হারে কর দেবে। আর যদি তা না হয় তাহলে ১২ শতাংশ হারে কর দেবে। এটি রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ। দ্বিতীয়ত ব্যাংক-বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টোব্যাকো, টেলিকম ছাড়া অন্য কয়েকটি খাতে শর্তসাপেক্ষে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। এটি অনেক দিনের দাবি ছিল। এটিও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কাজে দিতে পারে। সেই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে উৎসে কর কমানো হয়েছে। যেমন শিল্পকারখানায় কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে। এগুলোতে ক্যাশ আটকে থাকত। এটি কমানো হয়েছে। এ উদ্যোগ সংশ্নিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ ফ্লো সহজ করবে। চমকের মধ্যে এগুলো বড় চমক।
আর উদারতার মধ্যে যেটি লক্ষণীয় সেটি হচ্ছে, কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যক্তি করদাতা যদি গত বছর আয়কর রিটার্ন দাখিল না করে থাকেন, তাহলে জরিমানা দিতে হবে না। আবার কিছু ভুল উদারতাও আছে। এ ধরনের উদারতা কর দেওয়াকে উৎসাহিত করবে না। বিদেশে পাচারকৃত টাকা, যেটি দিয়ে বাড়ি কেনা হয়েছে বা দোকান করা হয়েছে, সেটি যদি প্রদর্শন করা হয় তাহলে নির্দিষ্ট কর দিলে তার বৈধতা দেওয়া হবে। করের হারও এ ক্ষেত্রে কম, যা সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করবে। বলা হচ্ছে, এটি এক বছরের জন্য আসছে। কিন্তু আমাদের দেশে এসব জিনিস একবার এলে সেটি আর যেতে চায় না।
আর উদাসীনতার সবচেয়ে বড় জায়গা হচ্ছে, মূল্যস্ম্ফীতি ও ডলার সংকটের ক্ষেত্রে বাজেটে তেমন কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বরং উল্টো পথে চলার একটা লক্ষণ আছে। ঘাটতির পরিমাণ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিতে চাহিদার একটা তাপ গড়ে উঠছে, যেটি অর্থমন্ত্রীও বাজেট বক্তৃতায় বারবার বলেছেন। কিন্তু সেই তাপকে বাতাস দেবে এই ঘাটতি। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমদানি কমানোর জন্য কর বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি লম্বা তালিকা আছে। এটি আমদানি কমাতে সহায়ক হবে, কিন্তু মূল্যস্ম্ফীতির চাপ সৃষ্টি করবে। এসব জিনিস মধ্যবিত্তরাই বেশি কেনেন।
মূল্যস্ম্ফীতিকে বাজেট বক্তৃতায় এক নম্বর চ্যালেঞ্জ বলেছেন অর্থমন্ত্রী। বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছে। এটি না বাড়ালে বিদ্যুৎ-সারের দাম বাড়াতে হতো। বৃদ্ধি যেটি হতে পারত সেটি হয়তো হতে দেওয়া হলো না। কিন্তু এরই মধ্যে যে দাম বেড়েছে, তা কমানো বা সহনীয় কিংবা দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করার জন্য দৃশ্যমান তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়ানো দরকার ছিল; ভাতা বাড়ানোর দরকার ছিল। এসব বিষয়ে উদাসীনতা আছে। আগামী অর্থবছরে মূল চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ম্ফীতিই হবে। মূল্যস্ম্ফীতিকে কমিয়ে আনা ও সহনীয় রাখার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য বা চমকপ্রদ কোনো পদক্ষেপ নেই। কৃচ্ছ্র সাধনের কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না।
মূল্যস্ম্ফীতি কমানো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো- এ দুটো কীভাবে একসঙ্গে হবে, সেটি দেখার বিষয়। তা একমাত্র সম্ভব যদি অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় পরিবহন খাতের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়বে; কিন্তু পদ্মা সেতু আমাদের দীর্ঘমেয়াদি রিটার্ন দেবে। এই বছরই সব পাওয়া যাবে- সেটি আশা করা যায় না। এ রকম আশা করলে তা পদ্মা সেতুর প্রতি অবিচার করা হবে।
রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় খুব একটা বদলায়নি। ১১ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি রয়েছে। সংশোধিত বাজেটে এটি ছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। আর প্রস্তাবিত বাজেটে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাহলে আয় আসবে কোত্থেকে? এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু তা কতটা কাজ করবে, বলা যায় না।
বাজেটে ঘাটতি বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে বলেই সেটা বাস্তবায়ন করতে হবে, সেটা নয়। বিশেষ করে চলতি ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারকে অনেকটা সাবধান হতে হবে। প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ ইত্যাদিতে বরাদ্দ বেড়েছে। এগুলো তো হওয়ার কথা নয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) দেশীয় অর্থায়নে যেসব আমদানিনির্ভর প্রকল্প রয়েছে, সেখানে অনেক সংযত হতে হবে। কারণ এখন কৃচ্ছ্র সাধন ছাড়া মূল্যস্ম্ফীতি ও ডলারের সমস্যা দুটোকে একই সঙ্গে মোকাবিলা করা যাবে না। আমদানির ওপর শুল্ক্ক কর বাড়িয়ে আমদানি ব্যয় ও ডলারের চাহিদাকে কমানো যেতে পারে। কিন্তু এটা আবার মূল্যস্ম্ফীতিকে উস্কে দেবে। কাজেই এটা একটা সংকট সমাধান করবে, আবার আরেকটা সংকট তৈরি করবে। তাই এমন একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে, যার মাধ্যমে উভয় সংকটকে একসঙ্গে মোকাবিলা করা যায়। এর অন্যতম পথ হচ্ছে কৃচ্ছ্র সাধন।
(লেখক :সাবেক লিড ইকোনমিস্ট, বিশ্বব্যাংক)
