সিপিডির পর্যালোচনা
সরকারের জন্য বড় সুযোগ একই সঙ্গে কঠিন পরীক্ষা
বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন ও সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান- সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৯:২০ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৯:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট সরকারের প্রথম বড় সুযোগ বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। পাশাপাশি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই বাজেট নতুন সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষাও বটে।
প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করে এমন পর্যবেক্ষণ জানিয়েছে সিপিডি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর হোটেল লেকশোরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির পর্যালোচনা তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও এতে বক্তব্য রাখেন।
সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়, বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যেগুলো দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং জনগণের কাছে দৃশ্যমান ফলাফল পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই বাজেট নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শনের এটিই সরকারের প্রথম বড় সুযোগ। বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার যদি কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে বাজেট প্রস্তাবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সংস্কারে নজর নেই।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন খাত ও সূচকের প্রাক্কলনের যে ভিত্তি ধরা হয়েছে, তাতে বড় দুর্বলতা রয়েছে বলেও মনে করে সিপিডি। বেসরকারি গবেষণা সংস্থাটি বলেছে, রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণ, রপ্তানি আয়ের প্রাক্কলনের এই দুর্বলতা বাজেটের শৃঙ্খলার পরিপন্থি। ভুল ভিত্তির কারণে বাজেট প্রস্তাবে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অর্জন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণসহ বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখাসহ বেশ কয়েকটি বাজেটীয় পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয় সিপিডির পক্ষ থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ও সংস্কারের পদক্ষেপ না থাকা ও বড় থোক বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। তবে বাজেট প্রস্তাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দ, ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ডসহ বেশ কিছু উদ্যোগের প্রশংসা করেছে সংস্থাটি।
সামষ্টিক অর্থনীতির সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এটি বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট। বাজেটটি এমন সময়ে দেওয়া হয়েছে, যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে এবং গত প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কম। কর্মসংস্থান হচ্ছে না। রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি রয়েছে। ব্যাংকিং খাতও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মোটামুটি অবস্থায় থাকলেও গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সংকট।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তর্নিহিত দর্শন হলো মানব উন্নয়ন, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনকল্যাণমূলক খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজেটের এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ, নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নের বিষয়গুলোতে মিল রয়েছে। তবে বাজেটের সাফল্য আকারের ওপর নয়, বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায়নি।
বাজেট প্রস্তাবে ভালো দিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের জন্য করকাঠামোর একটি প্রক্ষেপণ বা পথরেখা দেওয়া হয়েছে। করের ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা থাকা একটি ইতিবাচক দিক। এর ফলে করদাতারা আগে থেকেই জানতে পারেন যে, কত আয় করলে কত টাকা কর দিতে হবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ খরচ ও আর্থিক পরিকল্পনায় সাহায্য করে। কর প্রস্তাবনায় সামগ্রিকভাবে অনেক ধরনের ভালো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। করপোরেট করের ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য। এখানেও এক ধরনের পূর্বানুমান দেওয়া হচ্ছে।
সিপিডি বলেছে, কর ছাড়ে জনগণ ও ব্যক্তি খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদনে করছাড় ভালো উদ্যোগ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দ ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। কিডনি ডায়ালাইসিস যন্ত্রপাতি আমদানি শুল্ক কমানো, ফ্যামিলি কার্ডে বরাদ্দ, ফার্মার কার্ড ভালো উদ্যোগ। তবে সরকার একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার থেকে বাজেটে শুল্কছাড় ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো ভালো কিছু প্রস্তাব দিলেও সেগুলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও সুশাসনের অভাব বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিতে পারে। বাজেটের আকার চিন্তার নয়, বাস্তবায়নে ধারাবাহিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা বড় কথা। এটা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
এ প্রসঙ্গে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কেবল শুল্কছাড় বা বিশেষ সুবিধা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ বা নীতিগত সুবিধার চেয়েও গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সংস্কারের বিষয়ে বাজেটে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা নেই।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেট প্রাক্কলনের জন্য যে ভিত্তি ধরা হয়েছে, তা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রপ্তানি, রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি খাতের ঋণে একটি বৈপ্লবিক ও অলৌকিক পরিবর্তন আসবে ধরে নিয়ে আগামী বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রপ্তানিতে বর্তমানে প্রবৃদ্ধি যেখানে ঋণাত্মক (-১.৮ শতাংশ), সেখানে আগামী বছর ৮ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। এই দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেট প্রাক্কলন করা বাজেটের শৃঙ্খলার পরিপন্থি। এ রকম ভুল প্রাক্কলনের আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা ও জিডিপি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জন হবে না। এই বাস্তবতায় আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে যখন বিভিন্ন পরিসংখ্যান আসবে তখন বিষয়টি বোঝা যাবে।
তিনি বলেন, বাজেটে প্রায় পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বাড়তি সম্পদ আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। এক বছরের মধ্যে এই বিশাল রাজস্ব আদায় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। যদি রাজস্ব আদায় কম হয় এবং সরকারি ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের বড় লক্ষ্যমাত্রা এবং তা পরিশোধের চাপ সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কর কাঠামোতে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই করের বোঝা অনেক বেশি পড়ছে। সেই বিবেচনায় প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে মাত্র তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বর্তমান বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে এই সামান্য বৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই করমুক্ত আয়ের সীমাটা উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে কতখানি আমলে নিতে পেরেছে, সেটি একটি বড় প্রশ্নের বিষয়।
বরাবরের মতোই অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা আবাসন খাতে জমি, ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করার সুযোগ বহাল রাখার সমালোচনা করে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কালো টাকা সাদা করার এই সুযোগ করের ন্যায্যতা নষ্ট করে। যারা নিয়মিত ও সততার সঙ্গে কর দিয়ে আসছেন, তাদের সঙ্গে এটি এক ধরনের চরম বৈষম্য। এটি সমাজে নৈতিক স্খলনের ঝুঁকি তৈরি করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অতীতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার সুফল পাওয়া যায়নি। ফলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক কোনো বিচারেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ যারা সঠিকভাবে কর দিচ্ছেন, তাদের জন্য এটি অনুৎসাহ সৃষ্টি করে। রাজনৈতিকভাবেও এটা ইতিবাচক নয়। কারণ সাধারণ মানুষ এতে মনে করেন, যারা দুর্নীতি করেছে, কর ঠিকমতো দেয়নি, সরকার তাদের সুবিধা দিয়েছে। আর সাধারণ মানুষের ওপরে কর চাপানো হচ্ছে।
- বিষয় :
- সিপিডি
- বাজেট
- বাজেট ২০২৬-২৭
