সেমিনারে বক্তারা
শুধু উৎপাদন নয়, পোল্ট্রি খাতকে লাভজনক ও নিরাপদ করতে হবে
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০২:০৫
পোল্ট্রি খাতকে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে খামারের লাভজনকতা, নিরাপদ খাদ্য, জলবায়ু সহনশীলতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার দিকে নজর দিতে হবে। এ জন্য খামারি, সরকার, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
গত শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার আন্তর্জাতিক কারিগরি সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার জন্য সহনশীল পোল্ট্রি উৎপাদন’ শীর্ষক সেমিনারে সরকার, শিল্প খাত ও শিক্ষাবিদদের আটজন বক্তা বক্তব্য দেন।
সেমিনারে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মশিউর রহমান, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক শাকিলা ফারুকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, উৎপাদন বাড়লেও পোল্ট্রি খাত সঠিক মূল্য পাওয়ার সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।
তার হিসাব অনুযায়ী, গত ২০ মাসে ব্রিডার খামারগুলো প্রায় ১ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য, জাতীয় পোল্ট্রি নীতির আইনি ভিত্তি এবং বীমা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শীতল সরবরাহব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুর রহমান বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি এখন মান ও লাভজনকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। খামার থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্যনিরাপত্তা, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণাগারের প্রযুক্তি খামারিদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার কথাও বলেন তিনি।
বাংলা-ইউকে এগ্রো প্রোডাক্টসের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, কম খাদ্য খরচে বেশি ওজন পাওয়াই সব সময় সবচেয়ে বেশি লাভজনক নয়। ওষুধ প্রয়োগের পর নির্ধারিত বিরতি মেনে চলা এবং তুলনামূলক বেশি ওজনের মুরগি বাজারজাত করলে খামারের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা দুটোই বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমদাদুল হক চৌধুরী একটি গবেষণা তুলে ধরে বলেন, পরীক্ষিত কোনো নমুনায় গ্রোথ হরমোন বা বৃদ্ধিবর্ধক হরমোনের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তিনি ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ নিয়মিত পরীক্ষা, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ এবং জীবন্ত মুরগির বাজারে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, খাদ্যের দক্ষ ব্যবহার, শক্তির সাশ্রয় ও মুরগির মৃত্যুহার কমানোর মাধ্যমে খামারের খরচ এবং কার্বন নিঃসরণ দুটোই কমানো সম্ভব। বায়োগ্যাস, জৈব সার ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে খামারের বর্জ্য ও শক্তিকে আয়ের উৎসে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বেবি রানী কর্মকার বলেন, আন্তর্জাতিক হালাল বাজারে বাংলাদেশের পোল্ট্রি পণ্যের সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ, মানসম্মত পরীক্ষাগার এবং বাজারভিত্তিক নির্দেশনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান সিকদার বলেন, বার্ড ফ্লুর ঝুঁকি থাকায় কোন দেশে কোন পণ্য রপ্তানি করা যাবে, তা আলাদাভাবে নির্ধারিত হয়। তার ভাষায়, আমদানিকারকেরা দাবির চেয়ে প্রমাণকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাই একটি নির্দিষ্ট পণ্য, নির্দিষ্ট বাজার ও নিয়ন্ত্রিত সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে রপ্তানি শুরু করার পরামর্শ দেন তিনি।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, সুস্থ বাণিজ্যের ভিত্তি হলো সুস্থ খামার। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় মানদণ্ড তৈরি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। খামারি যে দাম পান এবং ভোক্তা যে দাম দেন, তার মধ্যকার ব্যবধান কমাতেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
- বিষয় :
- খামার
- পোলট্রি শিল্প