বাজারদরের তাৎক্ষণিক তথ্য সবজি কৃষকদের ন্যায্য দাম পাওয়ার সক্ষমতা বাড়িয়েছে
কৃষক এবং শহুরে বাজারের মধ্যে দামের ব্যবধান কমেছে
ছবি-সংগৃহীত
মাইনুদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:৪৮
মোবাইল ফোনের সুবাদে গ্রামীণ সবজি কৃষকরা শহরের বাজারে তাদের উৎপাদিত পণ্যের তাৎক্ষণিক দাম জানতে পারেন। দেশের উত্তরাঞ্চেলের সবজি বিকিকিনির অন্যতম বৃহৎ বাজার বগুড়ার মহাস্থানের কৃষক এবং ছোট ব্যবসায়ীরা এমন তথ্য জানিয়ে বলেছেন, এখন তারা তাদের উৎপাদিত সবজির দামের একটি বাস্তবসম্মত ধারণা নিয়েই বাজারে আসেন।
তাদের মতে, মোবাইল ফোনের কল্যাণে পণ্যের দাম সম্পর্কে তথ্য সহজে পাওয়া এটি তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত দাম সরবরাহ এবং চাহিদার ওপর নির্ভর করে।
উন্নয়ন বিষয়ক সাহিত্যে উদ্ধৃত গবেষণাগুলো ইঙ্গিত করে যে, মোবাইল সংযোগ তথ্য অনুসন্ধানের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। সবজি চাষিরা এখন প্রায়ই ফসল কাটার আগে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য ভয়েস কল এবং এসএমএস সেবা ব্যবহার করেন।
বগুড়া সদর উপজেলার রহমতবালা গ্রামের কৃষক মো. আমিনুল ইসলাম (৩৬) এক একর জমিতে মূলা, লাউ, কুমড়া এবং বরবটি চাষ করেছেন। ২ অক্টোবর, তিনি মহাস্থান সবজি বাজারে মূলা নিয়ে আসেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তিন দিন আগে আমি জানতাম প্রতি মণের (৪০ কিলোগ্রাম) দাম প্রায় ১,০০০ টাকা ছিল, কিন্তু আজ তা প্রতি মণ ৫০০-৬০০ টাকায় নেমে গেছে। এটি বেশি সরবরাহের কারণে এবং কারণ গরম আবহাওয়ায় চাষ করলে এই সবজির মান কখনও কখনও ভালো হয় না।”
“কৃষকরা দাম ঠিক করার জন্য একত্রিত হতে পারেন না। কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন আছে, তাই উভয়েই সরবরাহ এবং চাহিদা সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন।”
শিবগঞ্জের উথলী থেকে আসা রাব্বি মোল্লা (২৫), এবার প্রায় ৫০ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করেছেন। ক্ষেত থেকে সবজি সংগ্রহের আগে অন্যান্য কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য দাম সম্পর্কে একটি ধারণা নিয়ে নেন।
তিনি বলেন, “আমি ক্ষেত থেকে কিছু ফুলকপি বিক্রি করেছি। আমি এখানে (মহাস্থানে) আসি বেশি দামের আশায়। কখনও দাম বাড়ে, কখনও কমে। যখন ঢাকা বা অন্যান্য শহরে সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পায়, তখনই পাইকার এবং ব্যবসায়ীরা আমাদের ভালো দাম দেন।”
দামের পরিস্থিতি বুঝে, অনেক পাইকার কৃষকদের কাছ থেকে মৌসুমি সবজি কিনে মহাস্থানভিত্তিক আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন, যারা ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে তাদের সমকক্ষদের কাছে পণ্য পাইকারি পরিমাণে বিক্রি করেন।
এমনই একজন ব্যবসায়ী শিবগঞ্জের বিচোকের মাসুম ইসলাম (২৭) তিনি বলেন, “আমি আজ কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ ১,৬০০ টাকায় করলা কিনেছি, ১,৮০০ টাকায় বিক্রি করার আশা করছি। আমরা এটি পেতে সংগ্রাম করছি কারণ আমরা আগে থেকে সঠিক দাম জানি না,” তিনি বলেন, মহাস্থানের পাইকাররা শহরের পাইকারদের কাছ থেকে পাওয়া অর্ডারের ওপর এবং সরবরাহের ওপর নির্ভর করে সবজি কেনেন। বর্তমানে শসা, বেগুন, ঝিঙে, কুমড়া, বরবটি এবং জলপাই প্রচুর পরিমাণে রয়েছে।
“সরবরাহ যত বেশি, আমাদের লাভজনকতাও তত বেশি। কিন্তু যখন ঢাকায় চাহিদা বেশি থাকে, কৃষকরাও বেশি দাম চান। সবাই ফোন বা ফেসবুকের মাধ্যমে চাহিদা এবং সরবরাহের ওপর নজর রাখে। কৃষকরা এখন যে কোনো দাম বৃদ্ধির একটি অংশ পান,”-বলেন বগুড়ার লাহিড়ীপাড়ার আবদুল হামিদ প্রামাণিক (৪৮)। যিনি প্রায় এক দশক ধরে সবজির পাইকারি ব্যবসা করছেন।
মহাস্থান বাণিজ্যকেন্দ্র বিভিন্ন শহরে সবজি সরবরাহ করে। এখানে প্রায় ২০০ জন পাইকার এবং ৭০ জন পাইকারি ব্যবসায়ী (বাণিজ্যিক আড়তের মালিক) রয়েছেন। তাদের মধ্যে আল-মামুন (৪০) এমনই একটি আড়তের মালিক। প্রতিষ্ঠানের সাম মাইশা ট্রেডার্স। তিনি তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জানান, কৃষক এবং ছোট ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে, যা কৃষকদের একটি ন্যায্য দাম নিশ্চিত করছে।
তিনি আরও বলেন, “এটি ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করেছে। এখন কৃষক বিক্রি দর এবং পাইকারি দরের মধ্যে বিশাল পার্থক্য দেখা জায় না। অবশ্যই যে কোনো দাম বৃদ্ধি ভোক্তাদের প্রভাবিত করে, কিন্তু কৃষকরা উপকৃত হন।”
ঢাকার মিরপুরের বিশাল ভাণ্ডার পাইকারি আড়তের প্রতিনিধি হিসেবে হেফজুল বারী ফকির (৪০) মহাস্থানেই থাকেন। তিনি বলেন, “আমি প্রতিদিন সকালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঢাকা থেকে সবজির চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য দামের নির্দেশনা পাই। এর পর কৃষক এবং ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সবজি কিনি এবং সেগুলো ঢাকায় পরিবহন করি। কিন্তু অনেক সময়ই ঢাকা থেকে দেওয়া দামে সবজি কেনা যায় না। আর কখনও কখনও সম্ভব্য দামের চেয়ে কম দামেও কিনতে পারি। আবশ্য তা ঘটে প্রধানত: সবজির কম বেশি সরবরাহের ওপর।” উল্লেখ করেন তিনি।
“কৃষকদের বাজারের তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং তারা যে ব্যক্তি তাদের ভালো দাম দেয়, তার কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করেন। উৎপাদন কমে গেলে, অথবা যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হলে, সবজির দাম বেড়ে যায়।”
সবজি পচনশীল এবং দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা হিসাব করেছেন যে, ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর আগে উৎপাদিত সবজির ৩০% নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা এখন দ্রুত দামের তথ্য পেতে সক্ষম হওয়ায়, এটি তাদের দ্রুত সবজি বিক্রি করতে সহায়তা করা উচিত। আশা করা হচ্ছে, এটি নষ্ট হওয়া কমাবে।