নবডঙ্কা শান্তি পুরস্কার!
হাসান শাহরিয়ার
প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:০৯ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:১৪
আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম না বলেই বোধ করি রসায়ন, চিকিৎসা বা পদার্থে কে নোবেল পুরস্কার পেলেন, তা নিয়ে তেমন মাথা ঘামাই না। তবে সাহিত্য, অর্থনীতি এবং শান্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্পর্কে সব সময় আরও জানার চেষ্টা করি। বিশেষ করে শান্তি পুরস্কারের বিষয়টি আমি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য করি। প্রায় প্রতিবারই হতাশ হই। সিলেটি ভাষায় বলা যায় 'মুখ চিন্যা মুগের ডাইল'। বয়স্ক পাঠকদের নিশ্চয় মনে আছে, ১৯৭৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে। তখন মার্কিন ব্যঙ্গসাহিত্য রচয়িতা টম লেহরের বলেছিলেন, এই অবিস্মরণীয় ঘটনার পর সব রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ সেকেলে হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী সবাই সেদিন বুঝেছিলেন, 'যুদ্ধবাজ' কিসিঞ্জারকে 'শান্তির দূত' হিসেবে পুরস্কৃত করা ছিল গত শতাব্দীর সেরা বিদ্রুপ। উত্তর ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের জন্য শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয় কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনামের কূটনীতিক লে ডুক থো'কে। 'যুদ্ধ শেষ হয়নি এবং শান্তিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি'- এই যুক্তি দেখিয়ে থো পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। গত ১১৫ বছরে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি শান্তি পুরস্কার গ্রহণে অসম্মতি প্রকাশ করেন। 'অমন টাকায় ধিক' আর কি।
নোবেল কমিটির এ ধরনের সিদ্ধান্তে আগে যেমন সর্বত্র তোলপাড় হয়েছে, এখনও তেমনটি হচ্ছে। বলতে গেলে নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে অশান্তি দেখা দিয়েছে। এবার শান্তিতে নোবেল বিজয়ী হয়েছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস। তার নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বোধ করি সারাবিশ্বই হতচকিত হয়ে গেছে। আমেরিকান ও ব্রিটিশ মিডিয়া তো দস্তুরমতো হতবাক। যেন তাদের থোঁতা মুখ ভোঁতা হয়ে গেছে। যেখানে শান্তিই নেই, সেখানে প্রেসিডেন্ট সান্তোস শান্তি পুরস্কার পান কীভাবে? বামপন্থি বিদ্রোহী সংগঠন দ্য রেভলিউশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়ার (ফার্ক) সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করার জন্য তাকে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে। পুরস্কার বাবদ তিনি পাবেন একটি সোনার মেডেল ও ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার (১২ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার)। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কলম্বিয়ার জনগণ এ চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করার পরও নোবেল কমিটি তাকে পুরস্কৃত করেছে। যেন মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। এটা ভুল নয়; ইচ্ছাকৃত। তাই তো বিশ্ব মিডিয়া মনে করছে, শান্তি অর্জন নয়, শান্তি প্রতিষ্ঠায় 'আশাবাদী' হওয়ায় তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। চার বছরের আলোচনার পর ফার্ক নেতা 'তিমোচেংকো' বা তিমোলিয়ন জিমেনেজ (প্রকৃত নাম রর্ডিগো লন্ডনো) ও কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট সান্তোসের মধ্যে এ চুক্তি সম্পাদিত হয়। প্রেসিডেন্ট সান্তোসের পক্ষে এককভাবে শান্তি আলোচনা শুরু করা সম্ভব ছিল না। এ ক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের নেতা তিমোলিয়ন জিমেনেজের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা খাটো করে দেখা হয়েছে। তা না হলে এ পুরস্কার থেকে তিনি বাদ পড়বেন কেন? যদি যৌথভাবে তাদের দু'জনকে এ পুরস্কার দেওয়া হতো তাহলে সবাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন। তিমোলিয়ন জিমেনেজ অবশ্য বলেছেন, 'আমাদের জন্য একমাত্র পুরস্কার হলো শান্তি এবং তার সঙ্গে সামাজিক ন্যায়বিচার।'
প্রায় প্রতি বছরই শান্তি পুরস্কার নিয়ে এলাহি কাণ্ড বাধে। ১৯৩১ সালে জেইন অ্যাডামস পুরস্কৃত হন। তিনি ছিলেন আমেরিকার প্রথম নারী নোবেল বিজয়ী। অভিবাসীদের থাকার জন্য তিনি খোলা বাড়ি তৈরি করেন এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকেন। ১৯৫৩ সালে রেড ক্রসের প্রেসিডেন্ট ও মার্শাল প্লানের জনক জর্জ মার্শালকে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের পুনঃসংস্কারে তার ভূমিকার জন্য তাকে পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু যুদ্ধের সময়ই তিনি ছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর কমান্ডার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। ইউরোপের পুনঃসংস্কার ছিল অনেকটা গরু মেরে জুতাদানের মতো। ১৯৬৪ সালে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র শান্তিতে নোবেল পান। নোবেল কমিটি বলেছিল, পশ্চিমা বিশ্বের তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রমাণ করেন যে, সংঘাত ছাড়াও যুদ্ধ করা যায়। শান্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে কস্মিনকালে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৯ সালে মাদার তেরেসাকে বেছে নেওয়া হয় শান্তি পুরস্কারের জন্য। তিনি আজীবন মানবকল্যাণে কাজ করে গেছেন। পুরস্কার পাওয়ার পর তাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'বিশ্বশান্তির জন্য আমি কী করতে পারি ?' উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'বাড়ি গিয়ে নিজের পরিবারের লোকজনকে ভালোবাস।' তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাই লামাকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় ১৯৮৯ সালে। ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু সমস্যার কোনো মীমাংসা না হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৯৪ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন ইয়াসির আরাফাত, সাইমন পেরেস ও ইয়াজাক রবিন। নিম্ন পর্যায় থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য ২০০৬ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। নোবেল বিজয়ী হিসেবে বারাক ওবামার নাম ঘোষণা করা হয় ২০০৯ সালে। তখন বিশ্বব্যাপী এর সমালোচনা হয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে প্রবেশের মাত্র ১১ দিনের মাথায় নোবেল কমিটি এ বিষয়ে মনোনয়ন বন্ধ করে দেয়। ওবামার পরবর্তী আট মাসের কাজ মূল্যায়ন করে তাকে পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। যেন ঘোড়ার আগে গাড়ি জোতা। ওবামা নিজেই বলেছেন, তিনি এ পুরস্কারের যোগ্য নন। কারাবন্দি অবস্থায় শান্তি পুরস্কার লাভ করেন জার্মান সাংবাদিক ও শান্তিকামী কাল ভন অজিয়েস্কি, বর্মী রাজনীতিবিদ অং সান সু চি ও চীনা মানবাধিকার কর্মী লিউ জিয়াবো। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ভাগ্যে শান্তি পুরস্কার জোটেনি; তিনি পুরস্কৃত হন সাহিত্যে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাই শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।

নোবেল পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা সুইডিশ বিজ্ঞানী ও ডিনামাইট আবিস্কারক আলফ্রেড নোবেল বলেছিলেন- 'জতিগুলোর বন্ধুত্ব রক্ষা এবং বৃদ্ধি, যুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত সেনাবাহিনীর অপসারণ বা হ্রাস এবং শান্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রয়েছে এমন ব্যক্তিকেই শান্তি পুরস্কার দেওয়া হবে।' অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বিশ্ব রাজনীতির প্রভাবে নোবেল কমিটি তেলা মাথায় তেল দেয়। সারা বিশ্ব মহাত্মা গান্ধীকে শান্তির দূত বলেই জানে। কিন্তু নোবেল কমিটির কাছে তার কোনো মূল্যই ছিল না। তিন-তিনবার তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু নোবেল কমিটি তা আমলে নেয়নি। তবে ১৯৩৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মানবতার শত্রু অ্যাডল্ফ হিটলারের নাম প্রস্তাব করেছিলেন সুইডিশ পার্লামেন্টের সদস্য এরিক গটফ্র্রিড ক্রিস্টিয়ান ব্যান্ডট। তার এই মনোনয়নের তিন মাস আগেই পোল্যান্ড দখল করে হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন। যদি যুদ্ধে হিটলার জিততেন, তাহলে বোধহয় তিনিও শান্তি পুরস্কারে নন্দিত হতেন।
বছর চারেক আগে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস নোবেল বিজয়ী হলে বাংলাদেশের অনেকের মনেই অতীতের ব্যথা জেগে উঠেছে। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশেও পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর। এই চুক্তি সম্পাদনের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় আড়াই দশকের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান হয়। এই সুদীর্ঘ সময়ে সামরিক ও বেসামরিক শত শত লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। হাজার হাজার গৃহহারা পাহাড়ি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। চুক্তির বদৌলতে তারা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে। বিদ্রোহীদের নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) চুক্তি স্বাক্ষরের কিছুদিন পর থেকেই প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এই চুক্তি সম্পাদনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশ্বনেতারা অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। ইউনেস্কো তার মূল্যায়ন করেছিল। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দিয়ে তিনি মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সচেতন পশ্চিমা বিশ্ব তাকে 'মাদার অব হিউম্যানিটি' বা 'মানবতার জননী' হিসেবে আখ্যায়িত করে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তার নামও উচ্চারিত হয়েছিল। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট যে কাজটি করেছেন, শেখ হাসিনাও তা-ই করেছিলেন, কিন্তু তাকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়নি। এক যাত্রায় ভিন্ন ফল। এ জন্য কারও কোনো খেদ থাকা উচিত নয়। কারণ মহাত্মা গান্ধী যেখানে 'যোগ্য প্রার্থী' ছিলেন না, সেখানে শেখ হাসিনা কীভাবে 'যোগ্য' হবেন? তবে শেখ হাসিনার যদি 'মামার জোর' থাকত; তাহলে হয়তো তাকে পুরস্কার দেওয়া হতো; সঙ্গে বাংলাদেশকেও।
যেহেতু নোবেল কমিটি আলফ্রেড নোবেলের উইল পুরোপুরি অনুসরণ করছে না, সেহেতু বিশ্বের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে এখন নতুন করে শান্তির সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। সেইসঙ্গে পুরস্কারের বাছাই কমিটিতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করলে এ পুরস্কার আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে। নইলে নোবেল শান্তি পুরস্কার নয়; এর নাম দেওয়া হবে 'নবডঙ্কা শান্তি পুরস্কার'।
প্রবীণ সাংবাদিক; ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস, সিজেএ
- বিষয় :
- হাসান শাহরিয়ার
- বিশ্বব্যবস্থা
