ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

কালের আয়নায়

রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রদানে তুঘলকি কাণ্ড

রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রদানে তুঘলকি কাণ্ড
×

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২০ | ১৩:০৯ | আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২০ | ০৮:৩৫

স্বাধীনতা পুরস্কার একটি জাতির মেধা ও মনীষার স্বীকৃতি। বিশ্বের প্রায় সব দেশে এই জাতীয় নানা পুরস্কার দানের ব্যবস্থা রয়েছে। সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পুরস্কার আলফ্রেড নোবেলের নামাঙ্কিত নোবেল পুরস্কার। ওই পুরস্কারগুলো দেওয়ার ব্যাপারে আগে দলমত তেমন বিচার করা হতো না। সত্যিকার মেধা ও প্রতিভার অধিকারী মানুষদেরই এই পুরস্কার দেওয়া হতো। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর নোবেল পুরস্কার বিতর্কিত হতে থাকে। আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তিগুলো নোবেল পুরস্কারকে তাদের স্নায়ুযুদ্ধে ব্যবহার শুরু করে। ইদানীং তাদের বুকার ও পুলিৎজার পুরস্কারও বিতর্কিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যখন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, তখন শুরু হয় সোভিয়েতবিরোধী প্রচারণার জন্য লেখক ও বুদ্ধিজীবী ক্রয়। তার ঢেউ সাবেক পূর্ব পাকিস্তান পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিল। আর্থার কোয়েসলারের মতো বিশ্বখ্যাত লেখকও নিজেকে কমিউনিস্টবিরোধী প্রচারণার হোতা করেছিলেন এবং পুরস্কৃত হয়েছিলেন। আমেরিকার কৌশল ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং কমিউনিস্ট চীনে এমন সব লেখককে খুঁজে বের করা, যারা কমিউনিজমবিরোধী; কিন্তু বিশ্বমানের প্রতিভা নন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনকে বিব্রত করার জন্য এসব লেখককে নোবেল পুরস্কার দান এবং প্রচারণার জোরে তাদের বিশ্ববিখ্যাত করে তোলা হয়।
নোবেল পুরস্কার বর্তমানে বিতর্কিত এবং তার গৌরব হারিয়েছে। অতীতে বার্নার্ডশ নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বর্তমানেও তা গ্রহণে অনেকে আগ্রহী নন। নোবেল শান্তি পুরস্কার এক সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী, এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেওয়ার পর পুরস্কারটি বিতর্কিত হয়। বর্তমানে বুকার, পুলিৎজার ইত্যাদি প্রেসটিয়াস পুরস্কারগুলোও তাদের প্রেসটিজ অনেকটা হারিয়েছে।
বাংলাদেশে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাকিস্তান আমলেই প্রবর্তিত হয়। স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক প্রবর্তিত হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। পাকিস্তান আমলে আরেকটি সাহিত্য পুরস্কার ছিল, আদমজী পুরস্কার। সত্যি কথা বলতে কি, পাকিস্তান আমলে অনেক কুকর্ম হয়েছে। কিন্তু সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে জাতীয় পুরস্কার দানে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল না, কোনো সরকারি প্রভাব ছিল না। থাকলেও তা ছিল খুবই নগণ্য। এসব পুরস্কার দানে বিচারকমণ্ডলী ছিলেন দেশের সেরা বুদ্ধিজীবীরা; আমলারা নন।

সাহিত্য পুরস্কার দেওয়ার জন্য তখন বিচারকমণ্ডলীতে থাকতেন- ড. শহীদুল্লাহ্‌, ড. এনামুল হক, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, কবীর চৌধুরী, মুহাম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ। পুরস্কার লাভের জন্যও তখন মোটা ফি দিয়ে দরখাস্ত করে তারপর আমলা ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছে তদবির চালিয়ে তা পেতে হতো না। বিচারকমণ্ডলী তাদের বিবেচনামতো সে বছরের সেরা লেখকদের পুরস্কারটি দিতেন। পুরস্কার দানের জন্য কোনো নাম প্রস্তাবিত হলে তারা সকলে মিলে বিচার-বিবেচনা করে পুরস্কারটি দিতেন।
আমার স্মরণ আছে, পাকিস্তান আমলে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার দানের ব্যাপারে মাত্র একবার একটি আপত্তি উঠেছিল। সেটি সরকারের পক্ষ থেকে নয়, পুরস্কারদাতা আদমজীদের পক্ষ থেকে উঠেছিল। সে বছর পুরস্কারটি পেয়েছিলেন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক আবুল ফজল। তিনি অত্যন্ত প্রগতিশীল মনের মানুষ ছিলেন। তাতে তাকে পুরস্কার দানে তখনকার আইয়ুব-মোনায়েম সরকার আপত্তি করেনি। পুরস্কার পাওয়ার জন্য বিবেচিত আবুল ফজলের বইটিতে বলা হয়েছিল, 'ধর্ম কখনো সভ্যতার ভিত্তি হতে পারে না।' আদমজীরা আপত্তি তুলেছিল। পাকিস্তান ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে ধর্ম সম্পর্কে বিতর্ক তোলা যাবে না। শহীদ মুনীর চৌধুরী ছিলেন এই পুরস্কার দানের বিচারকমণ্ডলীর একজন। তার কাছে শুনেছি, পরে এই বইটির বদলে আবুল ফজলকে অন্য একটি বইয়ের জন্য আদমজী সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়।
এবার আসি স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে জাতীয় পুরস্কার দানের কথায়। এ বছর স্বাধীনতা পদক দানের জন্য যাদের মনোনীত করা হয়, তাদের মধ্যে একটি নাম এসএম রইজ উদ্দিন আহম্মদ। পুরস্কার দানের জন্য তার নাম ঘোষিত হওয়ার পরপরই নানা আপত্তি ওঠায় সংশোধিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তার নাম বাতিল করে দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ। শুনেছি, তার স্বাধীনতা পদক পাওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠায় মন্ত্রিপরিষদ এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই খবরটা শুনে বিস্মিত হইনি। সেই বিএনপি সরকারের আমল থেকে যাদের বিভিন্ন জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে, তাদের নামের তালিকায় বহু নাম দেখে মনে হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনা ও দলীয় স্বার্থে এদের পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। আমাদের কিছু বলার ছিল না। হাসিনা সরকারের আমলে আমাকে যখন স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়, তখন আমি নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম এ জন্য যে, জিয়াউর রহমান এই পদক এমন কলুষিত করে রেখে গেছেন যে, এই পুরস্কারের এবং এই পুরস্কার লাভের কোনো সম্মান ছিল না। বেছে বেছে অনেক রাজাকারকে দেওয়া হয়েছিল এই পুরস্কার। তাদের মধ্যে শর্ষিনার পীর সাহেবও আছেন।

আমি বিষয়টা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলাম এবং তার অনুরোধে স্বাধীনতা পুরস্কার নিতে সম্মত হই। এই পুরস্কার পেয়ে আমি কখনও সম্মানবোধ করিনি। এ বছর রইজ উদ্দিন আহম্মদের স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া নিয়ে বিতর্ক ওঠায় ও তার নাম বাতিল হওয়ায় বিস্মিত হইনি।
বিস্মিত হয়েছি, আগেও রাষ্ট্রীয়  পুরস্কারগুলো দেওয়ার ব্যাপারে বহু নাম কেন বিতর্কিত হয়নি এবং নামগুলো বাতিল হয়নি, তা ভেবে।
রইজ উদ্দিন সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানলাম, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সরকারি কর্মকর্তা। অনেক বই লিখেছেন। অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি আর যাই হোন, রাজাকার ছিলেন না, বরং মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন- এ কথা জেনে সান্ত্বনা পেয়েছি। যদি যোগ্যতার বিচারে তার নামটি বাতিল হয়ে থাকে তাহলে বলব, তার চেয়েও অনেক অযোগ্য ও অখ্যাত ব্যক্তিকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এখন রইজ উদ্দিন বিতর্কটি কেন তোলা হলো, এটাই আমার প্রশ্ন। এর পেছনেও কি কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ ও দলীয় বিবেচনা কাজ করছে?
যদি যোগ্যতার প্রশ্নে রইজ সাহেবের নামটি স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তদের নাম থেকে বাদ হয়ে থাকে, তাহলে মন্ত্রিপরিষদকে অনুরোধ করব, তারা যেন ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হোন, পুরস্কার দানের আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি বদলান এবং অতীতে ও বর্তমানে যেসব অযোগ্য ব্যক্তি রাজনৈতিক বিবেচনায় ও দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন, সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সেই নামগুলো বাদ দেন। পুরস্কারগুলোর মর্যাদা উদ্ধার করেন।
আমি যখন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছি, তখন দরখাস্ত করে, তদবির করে পুরস্কার পাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। আমি যে ইউনেস্কো সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছি, তা আমার জানা ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার তা আমাকে চিঠি লিখে জানান। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়ার বেলাতেও তাই। আমার পক্ষে কোনো আবেদন জানানো হয়নি। একুশে পদক পাই এরশাদের আমলে। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লা ও এমআর আখতার মুকুল লন্ডনে টেলিফোন করে আমাকে জানান, সরকার এ বছর আমাকে একুশে পদক দিতে চান, আমি নেব কিনা? আমি প্রথমে এরশাদ সাহেবের কাছ থেকে পুরস্কার নিতে অস্বীকৃত হই। কিন্তু সে বছর আবু জাফর শামসুদ্দীন ও শওকত ওসমানও এই পুরস্কার পাওয়ায় তাদের অনুরোধে পুরস্কার নিতে সম্মতি জানাই।
তারপর দীর্ঘকাল এই রাষ্ট্রীয় পুরস্কারগুলো সম্পর্কে খোঁজখবর রাখিনি। তবে পরিচিত ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের কেউ পেলে খুশি হয়েছি। এরপর দেখি, লন্ডনের অনেক বন্ধু এসব পুরস্কার লাভের জন্য সরকারি ফরম কিনে স্পন্সর বা প্রস্তাবক খোঁজার জন্য দৌড়াচ্ছেন। আমার এক বন্ধু, যিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকেও খেতাব পেয়েছেন, তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার লাভের জন্য লন্ডন-ঢাকা দৌড়াদৌড়িতে টাকা খরচ তো করেছেনই, তার ওপর আমলাদের ঘুষ দিয়েছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছি, এভাবে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার লাভ করে আপনি সম্মানিত হলেন কি?
আমার মনে হয়, রাষ্ট্রীয় পদক লাভের জন্য দেশে যদি আপাতত যোগ্য লোক পাওয়া না যায়, তাহলে দু'চার বছরের জন্য এই পুরস্কার দান স্থগিত রাখলে ক্ষতি কি? এই পুরস্কার দানে ভবিষ্যতে যাতে যোগ্য ব্যক্তিরা স্থান পান, তার নিশ্চয়তা যেমন দরকার, তেমনি দরকার অতীতে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকা থেকে অযোগ্য এবং দলীয় বিবেচনায় যারা পুরস্কার পেয়েছেন, তাদের নাম খারিজ করা।
লন্ডন, ১৩ মার্চ শুক্রবার, ২০২০

আরও পড়ুন

×