ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

মানবতার ভাগ্যাকাশে শবেবরাত

মানবতার ভাগ্যাকাশে শবেবরাত
×

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:৩২ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

এ বছর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে পবিত্র শবেবরাত তথা মহিমান্বিত ভাগ্য রজনী আমাদের নিকট সমুপস্থিত হয়েছে। সমগ্র পৃথিবীতে মরণ-ভাইরাস করোনার প্রভাবে আদম সন্তানরা নিজেদের জীবন নিয়ে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মাঝে কঠিন সময় অতিক্রম করছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক মানুষকে এ ভাইরাস আক্রমণ করেছে এবং ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। গোটা বিশ্বব্যাপী সামনের দিনগুলোয় আদম সন্তানদের ভাগ্যাকাশে আরও যে বেদনাদায়ক কত কী অপেক্ষা করছে, তা এক অজানা ও ভীতিকর গহ্বরে রয়েছে; অপ্রত্যাশিত এ মরণব্যাধি থেকে সমগ্র সৃষ্টিলোক যখন মুক্তির প্রহর গুনছে, ঠিক এমনই সন্ধিক্ষণে আশরাফুল মাখলুকাতের ভাগ্যদ্বারে পরিত্রাণের বার্তা নিয়ে হাজির হলো এবারের পবিত্র শবেবরাত। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও এ মহামারির ছোবল থেকে রেহাই পায়নি; প্রতিদিনই আক্রান্ত হয়ে চলেছে কেউ না কেউ। দুই শতাধিক আল্লাহর বান্দা এ মহামারিতে এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়ে গেছে এবং তাদের মধ্য থেকে ২০ জন ইহধাম ত্যাগ করেছেন। তবে আশার কথা হলো, এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সুচিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে আপন নীড়ে ফিরেও গেছেন। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ করোনার আঘাত মোকাবিলায় সাধ্যাতীত ব্যবস্থা গ্রহণ করে চলেছে; কিন্তু এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, বিশ্বের বহু উন্নত রাষ্ট্রও এ মহামারির প্রকোপ রোধে অত্যাবশ্যকীয় সব কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরও মৃত্যুর মিছিলে সমাপনী রেখা টানতে পারছে না। বিশ্বমানবের ভাগ্যের এমন নির্মম পরিহাসের প্রেক্ষাপটেই এসেছে এবারকার রহমত ও বরকতের শবেবরাত।

বিশ্বমানবতার পরম সুহৃদ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সিয়ামব্রত পালনের পবিত্র মাস রমজানের প্রাক্কালে মহান প্রভুর কাছে মিনতি করে বলতেন- 'আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রজাবা ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।' অর্থাৎ হে আল্লাহ, তুমি আমাদের ওপর রজব ও শাবানের বরকত দান করো এবং আমাদের মাহে রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও। মহানবীর (সা.) উল্লিখিত প্রার্থনাবাণীতে শাবান মাসে যে বরকত নিহিত রয়েছে, তা পরিস্টম্ফুট হয়ে উঠেছে। আল কোরআনে আমরা শাবানের সেই বরকতময় অবস্থার ইঙ্গিত পাই। সুরা দুখানের তিন থেকে পাঁচ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- 'নিশ্চয়ই আমি এক বরকতময় রাতে কোরআন অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চিতভাবে আমিই ভয় প্রদর্শনকারী। এ রাতে আমার পক্ষ থেকে আমারই নির্দেশে সব প্রজ্ঞাময় কর্মের ফয়সালা হয়ে থাকে। আর অবশ্যই আমি সবকিছুর প্রেরণকারী।' পবিত্র কোরআনের বিশ্নেষক ও ধর্মীয় প্রাজ্ঞজনের একটি বড় অংশের মতে, কোরআনে উল্লিখিত 'বরকতময় রাত' বলতে আরবি অষ্টম মাস শাবানের মধ্যরজনী তথা শবেবরাতকেই বোঝানো হয়েছে। মানুষের ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ, লাভ-ক্ষতি, সম্মান-অসম্মান, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিসহ সবকিছুই আয়াতে উল্লিখিত 'সব প্রজ্ঞাময় কর্মের ফয়সালা'র অন্তর্ভুক্ত, যা লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান তথা শাবানের মধ্যরাতে সম্পন্ন হয় বলে সংশ্নিষ্ট বিষয়ে বিশ্নেষকরা মত ব্যক্ত করেছেন। আর সে কারণে এই রাতকে শবেবরাত বা ভাগ্যরজনী হিসেবেও দেখা হয়। পবিত্র শাবান মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদার পেছনেও শবেবরাতের মহিমা ও তাৎপর্য অপরিসীম।

অনন্য মহিমা আর অনবদ্য বৈশিষ্ট্যে মোড়ানো এই পবিত্র শবেবরাত। এ রাত দোয়া-প্রার্থনা কবুলের রাত, এ রাত পাপাচার থেকে মুক্তি অর্জনের রাত, এ রাত বান্দার তওবা-অনুশোচনা মঞ্জুর হওয়ার রাত, এ রাত যাবতীয় বালা-মুসিবত তথা বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধারের রাত এবং এ রাত প্রতিটি মানুষের আগামী এক বছরের ভাগ্য নির্ধারণের গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এক রাত। রজব মাসের প্রথম রাত, দুই ঈদের রাত এবং শবেকদরের রাতসহ বান্দার দোয়া কবুল হয় যে পাঁচটি পবিত্র রাতে, তার অন্যতম হলো এই শবেবরাত। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, শবেবরাতের জন্য মহানবীর (সা.) নির্দেশনা হলো, দিবসে সিয়ামব্রত পালন আর রাতে আল্লাহর ইবাদত করা। কেননা, এ রাতে মহান আল্লাহর এক অপূর্ব রহমতের বারিধারা বর্ষিত হয়। দুনিয়াব্যাপী যে মহামারির ভয়াবহ প্রকোপ চলমান রয়েছে, তা থেকে অনতিবিলম্বে পরিত্রাণের লক্ষ্যে মহান পরওয়ারদিগারের কাছে তওবাসহ কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করাই হবে এবারের শবেবরাতের মূল কাজ। পরম করুণাময় তাঁর আপন মাহাত্ম্যে আমাদের সব আহাজারি কবুল করুন।

লেখক ও গবেষক; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×