সুশাসন ও সুস্থ রাজনীতির চ্যালেঞ্জ
এম হাফিজ উদ্দিন খান
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:০৬
বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড, ক্যাসিনোকাণ্ড,
শুদ্ধাচারের অভিযান ইত্যাদি এখন আলোচনার মূল বিষয়। রাজনীতি বলতে গেলে চলছে
এক ধারায়। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের জোরদার রাজনৈতিক অবস্থান জরুরি হলেও
বিদ্যমান বাস্তবতায় এর কোনো সাক্ষ্য মেলে না। রাজনীতি ও গণতন্ত্র এখন শুধু
সরকারি দলের অনুষ্ঠান-বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ, বাস্তবে মাঠে-ময়দানে
রাজনীতি পরিলক্ষিত হয় না। অথচ রাজনীতি মূলত মাঠের বিষয়, জনগণের সঙ্গে
সম্পৃক্ততার বিষয়। রাজনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে গেলে হতাশা চেপে
ধরে, বিভিন্ন প্রশ্ন দাঁড় করায়, একই সঙ্গে উদ্বেগের মাত্রাও পুষ্ট করে।
রাজনীতির যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা যেন এখন শুধু ভোটের আগে নির্বাচনী
ইশতেহারের লিখিত আকারে মেলে।
ক্যাসিনোকাণ্ডে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসছে। এমন অপকাণ্ড রাজনৈতিক
বলবান নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া চলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনেরও দায়
এড়ানোর পথ নেই। তবে সরকার ক্যাসিনোকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে আইনের
আওতায় নেওয়ার পাশাপাশি শুদ্ধাচারের যে অভিযান শুরু করেছে, তা আশাব্যঞ্জক
হলেও এর স্থায়িত্ব ও চূড়ান্ত কার্যকারিতা নিয়ে কেউ কেউ ইতোমধ্যে সংশয়
প্রকাশ করেছেন। আমি মনে করি, সরকার যদি তার অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি
বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় কিংবা থাকে, তাহলে সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে
তারা সফল হবে। সমাজের পরতে পরতে কীভাবে দুর্নীতি-স্বেচ্ছাচারিতা-অনিয়ম
জেঁকে বসেছে, ক্যাসিনোকাণ্ড এর অনেক কিছুই নতুন করে উন্মোচন করছে। ইতোমধ্যে
চলমান শুদ্ধি অভিযানের এক মাস অতিক্রম করেছে। আমি মনে করি, এই কার্যক্রম
নিয়মিত প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে হবে সুশাসন নিশ্চিত করার প্রয়োজনে।
ক্ষমতাসীন মহল থেকেই অভিযানটা শুরু হয়েছে এবং এটা একটা ইতিবাচক দিক বলে মনে
করি। তবে অন্যায়-অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের সবাইকে চিহ্নিত করে নির্মোহ
অবস্থান নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হলেই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বাস্তবায়ন হবে।
এক মাসের এই অভিযানের কার্যক্রম পর্ববেক্ষণ করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে
মূল্যায়নের অবকাশ খুব ক্ষীণ। এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে এবং সব স্তরে,
সব ক্ষেত্রে। রাঘববোয়ালদের সাম্রাজ্যে তছনছ হয়ে গেছে- এ কথা কেউ কেউ বললেও
আমি এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। এই সাম্রাজ্য একদিনে গড়ে ওঠেনি। এই
সাম্রাজ্যের অধিবাসী গুটিকতক লোকই নয়। এর শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এর বিস্তার হলেও প্রশাসনের ক্ষমতাবানদের আশীর্বাদও
রয়েছে বলে মনে করি। সবদিক ম্যানেজ করেই সমাজবিরোধীরা মুখোশ পরে অপকাণ্ডের
খতিয়ান বিস্তৃত করেছে। দেশ থেকে শত শত কোটি টাকা পাচার করেছে। বিশ্বের
বিভিন্ন দেশে গড়েছে সেকেন্ড হোমও।
ছাত্র রাজনীতির আজ যে বিবর্ণতা, এও অপরাজনীতিরই কুফল। লেজুড়বৃত্তি করতে
গিয়ে ছাত্র রাজনীতিকে আজ যে পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের
বিষয়। ছাত্র রাজনীতির নামে এমন অনাচার চলতে পারে না। এ দেশের ছাত্র
রাজনীতির অতীত গৌরব উজ্জ্বল অধ্যায়ের সঙ্গে বর্তমানের এই যে বিপরীত চিত্র,
তাও তো একদিনে সৃষ্টি নয়। ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা না
গেলেও চলমান ছাত্র রাজনীতির প্রতি সায় জ্ঞাপন করা যায় না। অবশ্যই এর নিরসন
দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান অর্জনের উর্বর ক্ষেত্র। সম্প্রতি সমকালের
ধারাবাহিক প্রতিবেদনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে 'টর্চার সেল'-এর যে চিত্র
ফুটে উঠেছে তা শুধু বিস্ময়কর নয়, প্রশ্নবোধকও। মূল দলের নীতিনির্ধারকরা কি
এসব ব্যাপারে আগে থেকে কিছুই জানতেন না? তারা যদি বলেন- এমনটি তাদের জানা
ছিল না, তবে এমন যুক্তির পক্ষে তাদের মত প্রকাশ প্রতিষ্ঠিত করা সহজ হবে না
বলেই মনে করি। দলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে সরকারে থেকে কি তা তারা
করবেন?
আমরা বিগত জাতীয় নির্বাচনের পরও (যদিও ওই নির্বাচন
প্রশ্নমুক্ত ছিল না) বারবার বলেছি, সুশাসন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
বহুমাত্রিক দুর্নীতি আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম সমস্যা। এই দুর্নীতির
স্পর্শ রাজনীতি থেকে শুরু করে একটি বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি পর্যন্ত
লেগেছে। তাই দুর্নীতি নির্মূলে শুধু অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতিই যথেষ্ট নয়,
দরকার সরকারের নির্মোহ অবস্থান নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ। আইনের মাধ্যমেই
দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে। স্বচ্ছতা-জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা ইত্যাদি নিয়ে এ
পর্যন্ত কথাবার্তা কম হয়নি; কিন্তু এরপরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফল মিলছে না।
সরকারের চলমান 'শুদ্ধি' অভিযানের ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের দৃঢ়তার কথা আমরা
সংবাদমাধ্যম মারফত জ্ঞাত হচ্ছি। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা অনেক
ক্ষেত্রেই প্রীতিকর নয়। তাই অনেকেই ভরসা রাখতে পারেন না শেষ পর্যন্ত দৃঢ়তা
কতটা বজায় থাকবে।
ক্যাসিনোকাণ্ডে
আটকদের কাছ থেকে নাকি অনেক তথ্যই মিলছে। এর সঙ্গে যেমন রাজনৈতিক-সামাজিক
বলবানরা সম্পৃক্ত, তেমনি প্রশাসনের অসাধুরাও যুক্ত আছেন বলে শুনছি। এসব
বিষয়ে আলোচনা করতে গেলেই ওঠে আসে রাজনীতির প্রসঙ্গ। মূলত রাজনীতি যদি এর
সংজ্ঞাসূত্র মতো না চলে, তাহলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তাই
সর্বাগ্রে দরকার রাজনীতির দোষ-ত্রুটি রাজনীতির মধ্য দিয়েই সংশোধন করা।
ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, বৈষম্যের নিরসন, রাজনীতির সমতল ভূমি নিশ্চিত করা
ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে কথাবার্তা কম হয়নি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য,
এর কোনো কিছুই এখনও নিশ্চিত করা তো দূরের কথা, কিয়দংশও বাস্তবায়ন করা
যায়নি। কাজেই এত জঞ্জাল জিইয়ে রেখে শুদ্ধাচারের প্রচেষ্টায় এত সহজে সফল
হওয়া যাবে না। এর জন্য অবশ্যই প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান, সদিচ্ছা,
কঠোরতা। দল-মতের ঊর্ধ্বে ওঠে ব্যবস্থাটা নিতে হবে। ব্যবস্থা ভালো করতে
পারলে অবস্থা এমনিতেই ভালো হবে। এ দেশে আইন নিজের গতিতে চলা মুশকিল।
ব্যক্তিসম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রভাবের মতো নানাবিধ বিষয় কীভাবে আইনের পথে বাধা
সৃষ্টি করে- এ রকম দৃষ্টান্তও তো আমাদের সামনে আছে। এখানে অনেক ক্ষেত্রেই
অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ থেকে উত্তরণের কাজটাও সহজ নয়। নানারকম
অপসংস্কৃতি আমাদের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আছে। জাতীয়
রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের প্রতিফলন যে শুধু ক্যাম্পাসেই পড়েছে তাই নয়,
সমাজের নানা ক্ষেত্রেই পড়েছে। ক্যাসিনোকাণ্ড এরই একটি। ছাত্র রাজনীতির যেমন
আমূল সংস্কার দরকার, তেমনি জাতীয় রাজনীতির সংস্কারটা জরুরি। লেজুড়বৃত্তি
তো শুধু ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরাই করছেন না, আরও অনেকেই লেজুড়বৃত্তি
করছেন, যাদের দায়িত্ব-কর্তব্য জনকল্যাণে নির্দিষ্ট করা রয়েছে। এই
অপসংস্কৃতির গণ্ডি ভেদ করতেই হবে। এ দেশে যেমন হতাশার ছায়া বিস্তৃত কিন্তু এ
কথা তো সত্য, আশার ক্ষেত্রও কম বিস্তৃত নয়। আশার নাভিকেন্দ্র যেন ধ্বংস
হয়ে না যায় এর দায় সর্বাগ্রে রাজনীতিকদের।
ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার রেওয়াজটা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। এটা
অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। পরমতসহিষুষ্ণতা এখানে অনুপস্থিত। আমিত্ববাদীদের
প্রভাব বাড়ছে। এসব কোনোটাই সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। বিগত
প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি আমরা বিশ্নেষণ করি, তাহলে ভিন্নমত
দমন-পীড়নের চিত্রটা খুব প্রকটভাবেই চোখে পড়ে। একটি গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক
সমাজ বা রাষ্ট্রে এমনটি তো কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমাদের সময়ে ছাত্র
রাজনীতি এমন কলুষিত ছিল না। সমান অধিকার আমরা ভোগ করেছি। আজকের ছাত্র
রাজনীতির বিবর্ণতার পেছনের কারণগুলো অচিহ্নিত নয়; কিন্তু প্রতিকারের কোনো
ব্যবস্থা এতদিন চোখে পড়েনি। এখন যা দেখে আমরা কিছুটা আশান্বিত হয়েছি এর
চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করছে সরকারের আন্তরিকতা, সদিচ্ছার ওপর।
আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানারকম অসঙ্গতি রয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক
কাঠামোতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। দায়িত্বশীল সবাইকে নিজ নিজ
দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। আমাদের আরও একটি বড় সমস্যা হলো
স্ববিরোধিতা। এই স্ববিরোধিতার নিরসন জরুরি। সবকিছুতেই দলীয়করণের অপ্রবণতাও
আমাদের পুরোনো ব্যাধি। সবকিছুতেই কেন দলীয়করণের ছাপ? রাজনীতির মূল লক্ষ্য
মানুষের কল্যাণ, দেশের উন্নয়ন, বৈষম্যের নিরসন, কলুষমুক্ত সমাজ গঠন। অনেক
উন্নয়ন হয়েছে এটি সত্য। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু
রাজনীতির উন্নয়ন কতটা হয়েছে? এটি এক অন্তহীন প্রশ্ন। রাজনীতির উন্নয়ন ঘটাতে
হবে, রাজনীতিকে কলুষতার ছায়ামুক্ত করতে হবে। এই জরুরি কাজ সর্বাগ্রে করা
দরকার। এটি করতে পারলে অনেক সমস্যার নিরসন হয়ে যাবে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক
ব্যবস্থায় কাম্য নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই বলেই আবরার ফাহাদকে
নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে। মতপ্রকাশের পথ মসৃণ নয় বলেই রাজনীতির নামে
দমন-পীড়ন চলে। আমরা প্রত্যাশার বিপরীত কাতারে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই না। আমরা
চাই একটি বিকশিত সমাজ। স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহির পাঠ পুষ্ট করতেই হবে।
ব্যক্তিস্বাধীনতার পথ মসৃণ থাকুক। সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে এই বিষয়গুলো
আমলে রাখা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- এম হাফিজ উদ্দিন খান

