ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিবাজি রাও থেকে যেভাবে তামিলনাড়ুর দেবতা হয়ে উঠলেন তিনি

শিবাজি রাও থেকে যেভাবে তামিলনাড়ুর দেবতা হয়ে উঠলেন তিনি
×

রজনীকান্ত । ছবি: সংগৃহীত

অনিন্দ্য মামুন

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ১৩:৪৮ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ১৮:০৫

ভারতের জনপ্রিয় সুপারস্টার রজনীকান্ত পা রাখলেন অভিনয়জীবনের সোনালি অধ্যায়ে। পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করলেন চলচ্চিত্রে। ১৯৭৫ সালের আজকের দিনে তিনি ‘অপূর্ব রাগাঙ্গাল’ সিনেমার মাধ্যমে রুপালি পর্দায় পা রাখেন। বিশেষ এই দিনে কার্তিক নামে একজন ভক্ত মধুরাইতে অবস্থিত রজনীকান্ত মন্দির ও অরুলমিগু শ্রী রজনী মন্দিরকে পাঁচ হাজার ৫০০টিরও বেশি ছবি দিয়ে সাজিয়েছেন। কয়েক বছর আগে উদ্বোধন হওয়া এই মন্দিরে রয়েছে ৩০০ কেজি ওজনের রজনীকান্তের একটি চমৎকার মূর্তি, যা অভিনেতার ভক্তদের গভীর আবেগের বহির্প্রকাশ বলা যায়। অভিনেতাকে দেবতা হিসেবে মনে করে কার্তিক এবং তাঁর পরিবার।

এভাবেই সিনেমার মাধ্যমে ভক্তদের মনে দেবতার মতোই আসীন হয়েছেন রজনীকান্ত। তার জন্য সিনেমা হল পরিণত হয়েছে মন্দিরে আর দর্শক হয়েছেন তাঁর ভক্তভজন। ৭৪ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি অভিনেতার অভিষেক ঘটেছিল কে বালাচন্দ্র এর হাত ধরে। তখন তার নাম ছিল শিবাজি রাও গায়কোয়াড়। যাকে বিশ্ব আজ রজনীকান্ত নামে চেনে। সেখান থেকেই শুরু— প্রায় ১৭০টি সিনেমা, অগণিত হিট, আর একের পর এক রেকর্ড।

ক্যারিয়ারের পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত উপলক্ষে গত ১৪ আগস্ট মুক্তি পেয়েছে তাঁর নতুন ছবি কুলি। আংশিকভাবে নিজের জীবনগাথার প্রতিফলেই এই ছবি। এখানেও তিনি শ্রমজীবী একনায়ক ধনী, শোষণকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। লোকেশ কঙ্গরাজের পরিচালনায় কুলি প্রথম দিনই সাড়া ফেলেছে। সিনেমাটির জন্য একদিন ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে। স্বর্ণ পাচারের পটভূমিতে গড়ে উঠেছে এ সিনেমার গল্প, যেখানে এক ‘কুলি’র অতীত আর বর্তমানের টানাপোড়েন তুলে ধরেছেন রজনীকান্ত। প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি রুপি বাজেটের  রয়েছেন আমির খান, নাগার্জুনা, উপেন্দ্র, সত্যরাজ ও শ্রুতি হাসান।

বর্তমানে রজনীকান্ত কেবল একজন অভিনেতা নন— তিনি এক সাংস্কৃতিক ঘটনা প্রবাহ। তাঁর জন্য নির্মিত হয়েছে মন্দির, প্রচারে ব্যবহৃত হয়েছে বিমান, শুধু ভারত নয়, দেশটির বাইরেও  তাঁর ভক্তের সংখ্যা অগণিত। ভারতে তাঁর ভক্তদের অনেকেই তাঁকে আধিদেবতার মর্যাদা দেন। কারও মতে, ‘ঈশ্বর যদি মানুষের রূপ নেন, তবে তিনি হবেন রজনীকান্ত।’

দারিদ্র্যের আঁধার থেকে উঠে আসা এই নায়কের জীবন কাহিনি অবিশ্বাস্য; যা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। বাবার চাকরি ছিল পুলিশ কনস্টেবল, কলেজ ছেড়ে প্রথমে কুলি হিসেবে কাজ করেছেন, পরে বাস কন্ডাক্টরের চাকরি। নাটকের প্রতি আগ্রহ দেখে এক বন্ধু তাঁকে ভর্তি করান মাদ্রাজ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। সেখানেই পরিচালক কে. বালাচান্দারের চোখে পড়েন তিনি।

তখনকার তামিল সিনেমার নায়করা যেখানে ছিলেন ফর্সা, পরিমিতভাষী ও ভদ্রচেহারার; সেখানে রজনীকান্তের শ্যামলা গাত্রবর্ণ, গ্রামীণ টান আর রাস্তার ছন্দময়তা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়। প্রথম দিকে ছিলেন খলনায়ক বা অ্যান্টি-হিরো, পরে বিল্লা (১৯৮০) দিয়ে প্রতিষ্ঠা পান অ্যাকশন হিরো হিসেবে। এরপর বলিউড, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র, এমনকি আমেরিকান ছবি ব্লাডস্টোনেও দেখা গেছে তাঁকে।
১৯৯০-এর দশক থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বড় পর্দার ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করা চরিত্র, কখনও আবার আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। সমালোচকরা একসময় তাঁকে শুধু “স্টাইল কিং” বললেও— চশমা ঘোরানো, সিগারেট ফ্লিক, সংলাপে ব্যঙ্গমিশ্রিত রসবোধ—তাঁর চরিত্রের মূলশক্তি বিশ্বস্ততা, সাহস, হাস্যরস আর ন্যায়পরায়ণতা।

রজনীকান্তের ভক্তরা কেবল সিনেমা দেখেই ক্ষান্ত নন তাদের অনেকেই সামাজিক সেবামূলক কাজ করেন তাঁর নামে। রক্তদান, ত্রাণ বিতরণ, কমিউনিটি অনুষ্ঠান— সবই চলে তারকাপূজার অংশ হিসেবে। ছবির মুক্তির দিন হয়ে ওঠে উৎসব— দুধ দিয়ে মূর্তি স্নান, পুষ্পবৃষ্টি, আতশবাজি আর ভোর থেকে সারিবদ্ধ অপেক্ষা। রাজনীতির মঞ্চে নামলেও তিনি কখনও দল গঠন বা নির্বাচন করেননি, ফলে রাজনীতিবিদ নন, কিন্তু নৈতিক দিশারি হিসেবে ভক্তদের কাছে সবসময়ই অনন্য।

পাঁচ দশকের এই অসামান্য যাত্রা উদযাপন করছে লাখো ভক্ত, ৫০,০০০ এর বেশি ফ্যান ক্লাব, আর গোটা ভারতীয় সিনেমা। দারিদ্র্যের গলি থেকে শুরু করে আকাশচুম্বি সাফল্য— রজনীকান্ত প্রমাণ করেছেন, বিনয়ী অথচ শক্তিশালী নায়ক বাস্তবেও দর্শকের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারে
 

আরও পড়ুন

×