সাক্ষাৎকার
ব্যর্থতা থেকেও অনেক কিছু শেখা যায়
মিলা ইসলাম। ছবি -সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ১২:২৬ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৫ | ১২:৩৭
মিলা ইসলাম। তারকা কণ্ঠশিল্পী। এরই মধ্যে গানের ভুবনে পথচলার দুই দশক পূর্ণ করেছেন তিনি। দীর্ঘ সংগীত সফরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরোনো, নিজস্ব ভাবনা নিয়ে কাজ করে যাওয়া, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ।
গানের ভুবনে পথচলার দুই দশক পূর্ণ হলো। পেছন ফিরে তাকালে এই দীর্ঘ সফর মনের পর্দায় কীভাবে ধরা দেয়?
আমার কাছে দুই দশক কোনো দীর্ঘ সময় মনে হয় না। এখনও মনে করি আমি শুরুতেই আছি। অনেকেই বলেন, ‘দীর্ঘ সফর’, কিন্তু আমি সেটিকে দীর্ঘ ভাবতে চাই না। কারণ, আমি এখনও অনেক কিছু দিতে চাই। অনেক মঞ্চ, অনেক গান, অনেক শ্রোতা আমার অপেক্ষায়। হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে যখন চুপ করে বসে থাকি তখন মনে হয় সত্যিই কি ২০ বছর পার হয়ে গেল? অথচ আমার মনে হয়, যেন কিছু দিন আগেই শুরু করলাম। শ্রোতার হাসিমুখ, তাদের উচ্ছ্বাস, আর মঞ্চে আমার নাম ধরে ডাকা– এগুলো আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন করে বাঁচায়, নতুন করে গান গাইতে অনুপ্রাণিত করে। আমি পরের ২০ বছর নিয়ে ভাবতে চাই– কীভাবে নতুন প্রজন্মের হৃদয়েও ছাপ রাখতে পারি। শ্রোতার ভালোবাসা আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই ভালোবাসাই আমাকে সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে দেয়নি; বরং নতুন শক্তি দিয়েছে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।
সংগীতাঙ্গনের পরিবেশ কতটা বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে?
কখনও বিরতি নিয়েছি বলে মনে পড়ছে না। গত ১০ বছর বা গত ৫ বছরের কথাই যদি মনে করি, আমি অনেক কনসার্ট করেছি দেশের ভেতর এবং দেশের বাইরেও। সংগীতের পরিবেশ হয়তো একটু বদলেছে, এটি স্বাভাবিক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলায়। শ্রোতার আবেগ বদলায়নি। আগে হয়তো গান ছড়িয়ে যেত অডিও ক্যাসেট, রেডিও বা টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে, এখন সোশ্যাল মিডিয়া আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুহূর্তেই পৌঁছে যায়। আমার কাছে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, এখন শ্রোতা তাদের প্রতিক্রিয়া সঙ্গে সঙ্গেই জানাতে পারে। এই পরিবর্তনটা আমার কাছে ইতিবাচক, কারণ এটি শিল্পীকে আরও চ্যালেঞ্জ নিতে শেখায়।
সিনেমার প্লেব্যাকের জন্য কিছু শিল্পী ও সংগীত পরিচালক একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে রেখেছেন– অনেকের এই কথার সঙ্গে কি একমত?
আমি বলব, প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রিতে কিছু বাস্তবতা থাকে, আমাদের ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, দিন শেষে শ্রোতাই আসল বিচারক। শ্রোতা যদি কোনো গান গ্রহণ না করেন, তবে কোনো সিন্ডিকেটই সেই গানকে বাঁচাতে পারবে না। যদি অনেকের কথা মেনে নেই যে সিন্ডিকেট আছে, তখন এটিও মনে রাখা উচিত, কয়েকজন শিল্পী বা সংগীত পরিচালকের নাম ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বাজারে আনা যায়– শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া যায় না, যদি গান ভালো না হয়। তাছাড়া এখন সময় বদলে গেছে। যারা মনে করছেন সিন্ডিকেটের কারণে তারা থেমে আছেন, তাদের বলব, এই সময়টা আসলে সুযোগের সময়। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক– এসব প্ল্যাটফর্ম দিয়ে আজকের দিনে অসংখ্য শিল্পী বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। বাংলাদেশের বাইরেও আমি দেখেছি, কোনো প্রভাব বা সিন্ডিকেট ছাড়াই, শুধু নিজের যোগ্যতা আর অক্লান্ত পরিশ্রমের জোরে শিল্পীরা কীভাবে লাখো শ্রোতার হৃদয় জয় করছেন।
বিরতির আগে যে জনপ্রিয়তা ছিল, তা কি ফিরে পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন?
আপনার কি মনে হয় আমি অনেক বড় বিরতি নিয়েছি? আমি কখনও জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটিনি। গান আমার ভালোবাসার জায়গা। গানের প্রতি আমার ভালোবাসা দেখিয়েছি, তারপর শ্রোতারা ভালোবাসা দিয়েছেন। ভালোবাসা হারিয়ে যায় না কখনও।
অডিও অঙ্গনে এক সময় যাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের সঙ্গে নতুন করে কাজ করার পরিকল্পনা আছে?
অতীতে যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তারা আমার ক্যারিয়ারের বড় অংশ। ভবিষ্যতে যদি সুযোগ হয়, আমি অবশ্যই চাইব আবারও একসঙ্গে কাজ করতে। তবে আমি এক্সপেরিমেন্ট ভালোবাসি, তাই নতুন জেনারেশন, নতুন প্রযোজক বা মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে কাজ করতেও আগ্রহী।
গানের ভুবনে এমন কে কে আছেন, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যাদের সঙ্গে কাজ করা হয়ে ওঠেনি?
অনেক সংগীতশিল্পী আছেন, যাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা করি। হয়তো কাজ করার সুযোগ হয়নি। আবার অনেক নতুন আছেন যাদের দেখে মনে হয় তাদের সঙ্গে কাজ করলে ভালো লাগবে। তবে আমি এটিকে কোনো আফসোস মনে করি না; বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা মনে করি। সময় হলে একদিন সেই যোগাযোগগুলোও হয়ে যাবে।
গসিপ, গুঞ্জন, বানোয়াট, মিথ্যা খবরগুলো মনের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে কি?
সত্যি বলতে, প্রথম দিকে এসব গসিপ আমাকে কষ্ট দিত। সময়ের সঙ্গে শিখেছি, এগুলোকে গুরুত্ব দিলে নিজের মনোবল নষ্ট হয়। এখন আমি নেতিবাচক কথাকে এড়িয়ে যাই, কারণ আমি জানি আমার কাজই আমার পরিচয়। আমার সম্পর্কে কোনটা গসিপ, গুঞ্জন, বানোয়াট, মিথ্যা বা সত্য সেটি আমি ভালো করেই জানি। ভক্তরা আমার গানকে ভালোবাসেন, এটিই আসল সত্য।
সাফল্য ও জনপ্রিয়তা কতটা উপভোগ করেন?
আমার কাছে সফলতা মানে শ্রোতার ভালোবাসা। জনপ্রিয়তা আসা-যাওয়ার বিষয়। মানুষ যদি আমার গান শুনে হাসে, নাচে বা কাঁদে– সেটিই সবচেয়ে বড় ব্যাপার আমার জন্য। আমি প্রতিটি মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন দর্শকের উচ্ছ্বাস দেখি, তখনই মনে হয় আমি সফল।
এখনও কি নানা ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করার বিষয়ে আগের মতোই সাহসী?
একজন শিল্পী যদি এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ করে দেয়, তাহলে তার এগিয়ে যাওয়া থেমে যায়। সব এক্সপেরিমেন্ট সফল হবে না, এটিও মানতে হবে। আবার ব্যর্থতা থেকেও অনেক কিছু শেখা যায়। আমি এখনও নতুন সুর, নতুন ফিউশন নিয়ে কাজ করতে ভয় পাই না। সফলতার পিছে ছুটলে সফল হওয়া যায় না, ভালো কিছু বানানোর চেষ্টাই সফলতাকে আপনার কাছে নিয়ে আসবে।
নতুন কী আয়োজন তুলে ধরার কথা ভাবছেন?
আগামীতে চাই এমন কিছু গান করতে, যা একদিকে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখবে, আবার আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির গন্ধও থাকবে।
- বিষয় :
- মিলা
- সঙ্গীতশিল্পী
