মেটাল কারখানায় কাজ, অডিশন থেকে বাদ, ধর্মেন্দ্রর জীবন ছিল সিনেমার গল্পের মতই
ধর্মেন্দ্র [১৯৩৫-২০২৫]
মীর সামী
প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:২২ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৩৯
বলিউডের ইতিহাস যখনই উল্টে দেখা হবে, একটি নাম অনিবার্যভাবে ফিরে আসবে– ধর্মেন্দ্র। তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন; তিনি এমন এক যুগের প্রতিনিধি, যাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি সোনালি অধ্যায় গড়ে উঠেছিল। তাঁর উপস্থিতি ছিল রোমান্সের কবিতা, অ্যাকশনের তেজ আর অভিনয়ে এক অদ্ভুত মানবিক গভীরতার মিশেল। দর্শক তাঁকে দেখত নায়ক হিসেবে। সহশিল্পীরা দেখতেন একজন পরিপূর্ণ অভিনয়শিল্পী ও অসাধারণ মানুষ হিসেবে।
মানবিকতার নায়ক
ধর্মেন্দ্রর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ১৯৬০ সালে– ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরে’ ছবির মাধ্যমে। কিন্তু সে সময় কেউই ভাবেননি একদিন এ মানুষটি বলিউডে ‘হ্যান্ডসাম হিরো’ নামে কিংবদন্তি হয়ে উঠবেন। তাঁর চোখে ছিল এক ধরনের কোমলতা, যা অনায়াসে ভেঙে দিত রুক্ষমনের মানুষকেও। শরীরী ভাষায় ছিল এমন এক শক্তি, যেন তিনি জন্মগতভাবেই নায়ক হতে এসেছেন। একইসঙ্গে রোমান্টিক ছবি হোক বা অ্যাকশন– যেমন ‘ধর্মাত্মা’, ‘শোলে’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘অনুপমা’, ‘সত্যকাম’, ‘প্রতিজ্ঞা’; প্রতিটি ছবিতে তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। শোলের বীরু চরিত্রটি দর্শকের মনে যেন আজও জীবন্ত। তাঁর সেই হাসি, সেই সংলাপ বলার অনবদ্য ঢং ‘বাসন্তী, ইন কুত্তো কে সামনে মাত নাচনা!’ এই সংলাপ বলিউডের ইতিহাসে অমর। চরিত্রটিতে যে হিউমার, যে মানবিকতা, যে সাহস, সবই যেন ধর্মেন্দ্ররই স্বভাবজাত। তাঁর অভিনয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল– অতি সহজ-সরল থাকা। তিনি কখনোই বেশি নাটকীয় হননি; কখনও অতিরিক্ত আবেগ দেখাননি। তাঁর প্রতিটি দৃশ্যেই ছিল স্বাভাবিকতা। সে কারণেই দশকের পর দশক পরেও তাঁর অভিনয় পুরোনো লাগে না।
ব্যক্তিত্বে বিনয়, আচরণে
ধর্মেন্দ্রর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তাঁর বিনয়। তিনি কখনও নিজেকে সুপারস্টার মনে করেননি। ইন্ডাস্ট্রির অনেক বড় অভিনেতা-অভিনেত্রীই সাক্ষাৎকারে বলেছেন– ‘ধর্মেন্দ্র যেমন পর্দায় সুন্দর, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি নম্র।’ সহশিল্পীদের সঙ্গে আচরণ, সেটে উষ্ণতা, জুনিয়রদের প্রতি সম্মান– সবই তাঁকে করেছে অনেকের প্রিয়। যে মানুষটি শত সিনেমার নায়ক, তিনি কখনও কাউকে ছোট করে কথা বলেননি। এমনকি নিজের সংগ্রামের সময়, নিজের ব্যর্থতার দিনগুলোও স্মৃতিতে রেখে চলেছেন গর্ব নিয়ে।
রোম্যান্সের কবি
ধর্মেন্দ্রকে ‘হ্যান্ডসাম হিরো’ বলা হয় ঠিকই, কিন্তু মানুষ তাঁকে আরও বেশি মনে রাখে তাঁর রোমান্টিক চোখের দৃষ্টির জন্য। ‘অনুপমা’তে তাঁর শান্ত-স্নিগ্ধ প্রেম, ‘চুপকে চুপকে’তে তাঁর হাস্যরসঘন রোম্যান্স, ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’-এ তাঁর অ্যাকশন-মেশানো প্রেম। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক রোমান্টিক নায়ক, কিন্তু কখনও অতিরঞ্জিত নন। হেমা মালিনীর সঙ্গে তাঁর অনস্ক্রিন কেমিস্ট্রি বলিউডে এক নতুন ভাষা তৈরি করেছিল। ‘শোলে’তে বাসন্তীর সঙ্গে বীরুর মিষ্টি কথোপকথন আজও দর্শকের ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটায়।
সংগ্রাম থেকে সাফল্যের শিখরে
পাঞ্জাবের লুধিয়ানার সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা ধর্মেন্দ্রর যাত্রা একেবারেই মসৃণ ছিল না। একসময় তিনি মেটাল কারখানায় কাজ করতেন। অভিনয়ের স্বপ্ন ছিল বুকের ভেতর, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে তাঁকে পেরোতে হয়েছে অনেক প্রতিকূলতা। ফিল্মফেয়ার ট্যালেন্ট হান্ট জেতা, মুম্বাইতে সংগ্রাম, অডিশন থেকে বাদ পড়া– সবই আছে তাঁর গল্পে। তবু তিনি হার মানেননি। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেছেন ‘দ্য হি-ম্যান অব ইন্ডিয়ান সিনেমা।’ এ সাফল্য এসেছে তাঁর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং অদম্য মনোবল থেকে।
ধর্মেন্দ্র: সময় যাকে হারাতে পারে না
বর্তমানে বলিউড প্রযুক্তিতে গল্পে পরিবর্তন এসেছে, নায়কের সংজ্ঞাও বদলেছে। কিন্তু ধর্মেন্দ্রর জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। তাঁর নাম শুনলেই দর্শকের মনে নস্টালজিয়ার মৌতাত যেন ছড়িয়ে পড়ে। এটাই তো কিংবদন্তির পরিচয়– যার উপস্থিতি সময়কে হার মানায় আর যাকে ভুলে থাকা অসম্ভব। ধর্মেন্দ্র শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি বলিউডের চিরকালের মহানায়ক।
দুই স্ত্রী, ছয় সন্তান, নয়জন নাতি-নাতনি
১৯৫৪ সালে ধর্মেন্দ্র প্রথম বিয়ে করেন প্রকাশ কৌরকে। এই দম্পতির চার সন্তান। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। তারা হলেন সানি দেওল, ববি দেওল, বিজেতা এবং অজিতা। সানি বিয়ে করেন পূজাকে। তাদের দুই ছেলে– করণ ও রাজবীর। এর মধ্যে করণ ২০২৩ সালে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু দৃশা আচার্যকে বিয়ে করেন। রাজবীর এখনও অবিবাহিত। ববি দেওল ১৯৯৬ সালে তানিয়া আহুজাকে বিয়ে করেন। তাদেরও দুই ছেলে– আরিয়ামান ও ধরম। সানি-ববির দুই বোন– বিজেতা ও অজিতা। কখনোই লাইমলাইটে আসেননি। বিজেতা একজন সাইকোলজির শিক্ষিকা আর অজিতা ব্যবসায়ী হিসেবে নিজ নিজ জীবনে ব্যস্ত। বিজেতা ১৯৮৮ সালে ব্যবসায়ী বিবেক গিলকে বিয়ে করেন। তাদের এক মেয়ে প্রেরণা এবং এক ছেলে সাহিল। তারা বর্তমানে দিল্লিতে থাকেন। অজিতা বিয়ে করেন হরিকিরণ সিং চৌধুরীকে। তাদের দুই মেয়ে– নিকিতা ও প্রিয়াঙ্কা। দুই বোনের মেয়েরাও কখনোই চলচ্চিত্র জগতে আসেননি। ধর্মেন্দ্র ‘শোলে’ সিনেমার শুটিং সেটে বলিউডের ড্রিমগার্ল হেমা মালিনীর প্রেমে পড়েন এবং সেই প্রেম পরিণতি পায় ১৯৮০ সালে। এটা তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। ধর্মেন্দ্র-হেমার দুই মেয়ে– এষা দেওল ও অহনা দেওল। এষা শুরুতে বলিউডে ক্যারিয়ার গড়ার চেষ্টা করলেও সফল হননি। পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যবসায়ী ভরত তখতানিকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির দুটি মেয়ে রয়েছে– রাধ্যা ও মিরায়া। কিছুদিন আগে এষা ও ভরতের বিচ্ছেদ হয়েছে। ধর্মেন্দ্রর সবচেয়ে ছোট মেয়ে অহনা বিয়ে করেন বৈভব ভোহরাকে। এই দম্পতির তিন সন্তান– যমজ দুই মেয়ে এবং একটি ছেলে।
আলোচিত ১০ সিনেমা
ছয় দশকের অভিনয় জীবনে ৩০০-এর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন ধর্মেন্দ্র। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ার থেকে আলোচিত ১০ সিনেমা বেছে নেওয়া সহজ নয়। তবে হিট, সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত ১০ সিনেমার তালিকা প্রকাশ করেছে ভারতের অনলাইন গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমস। চলুন জেনে নেওয়া যাক... ‘হকিকত’ (১৯৬৪)। ধর্মেন্দ্র এ সিনেমায় একজন সেনা কর্মকর্তার চরিত্রে আবেগপূর্ণ অভিনয় করেন। ‘অনুপমা’ (১৯৬৬)। হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন ধর্মেন্দ্র, শর্মিলা ঠাকুর। ‘ফুল অউর পাত্থার’ (১৯৬৬) এ ছবিই ধর্মেন্দ্রকে প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা থেকে সুপারস্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ‘সত্যকাম’ (১৯৬৯) ধর্মেন্দ্রর চরিত্রটি ছিল নৈতিকতা ও সততার সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের মিশেলে তৈরি। ‘সীতা অউর গীতা’ (১৯৭২) ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর কেমিস্ট্রি দর্শকদের মন জয় করেছিল।
‘জঙ্গু’ (১৯৭৩) ছবিতে ধর্মেন্দ্র অ্যাকশন দিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হন। ‘শোলে’ (১৯৭৫) ধর্মেন্দ্রর করা সিনেমায় বীরু চরিত্রটি এখনও মনে রেখেছেন দর্শকরা। ‘চুপকে চুপকে’ (১৯৭৫) হৃষিকেশ মুখার্জি সিনেমাটিতে তিনি বুদ্ধিমত্তা ও হাস্যরসের নিখুঁত সমন্বয় দেখান। ‘প্রতিজ্ঞা’ (১৯৭৫) ধর্মেন্দ্রকে এখানে দেখা গেছে প্রতিশোধপরায়ণ এক ন্যায়পরায়ণ তরুণ হিসেবে। ‘আপনে’ (২০০৭) অনিল শর্মার সিনেমাটিকে ধর্মেন্দ্রর পরের দিকের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সিনেমা বলা হয়।
সেরা ৫ চরিত্র
ধর্মেন্দ্র উপহার দিয়েছেন অসংখ্য হিট সিনেমা। দর্শক ও সমালোচকরা তাঁকে ভালোবেসেছেন শুধু তাঁর উপস্থিতির জন্য নয়; বরং কিছু অসাধারণ চরিত্রের জন্য, যা আজও বলিউড ইতিহাসে অমর।
অশোক: অনুপমা (১৯৬৬) হৃষিকেশ মুখার্জি নির্মিত এই ক্ল্যাসিক সিনেমায় শান্ত, সংবেদনশীল ‘অশোক’ চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেন ধর্মেন্দ্র। শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর রসায়ন ও সংযত আবেগ– চরিত্রটিকে আজও মনে রাখার মতো করে তুলেছে।
শাকা: ফুল আউর পাথর (১৯৬৬) ও. পি. রালহান পরিচালিত এই সিনেমাই তাঁকে রাতারাতি সুপারস্টার বানায়।
সত্যপ্রিয়া আচার্য: সত্যকাম (১৯৬৯) হৃষিকেশ মুখার্জির সঙ্গে আরেক মাস্টারপিস। দুর্নীতির মাঝে সততার লড়াই করা এক সৎ মানুষের চরিত্রে ধর্মেন্দ্র দেখিয়েছেন তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয়।
বিরু: শোলে (১৯৭৫) বলিউড ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক চরিত্রগুলোর একটি। বন্ধুত্ব, হাস্যরস, সাহসিকতা– সব মিলিয়ে বিরু চরিত্রে ধর্মেন্দ্র ছিলেন দুর্দান্ত। ‘শোলে’ তাঁকে কিংবদন্তির আসনে বসিয়ে দেয়।
প্রফেসর পরিমল ত্রিপাঠি: চুপকে চুপকে (১৯৭৫) ক্ল্যাসিক কমেডি সিনেমায় ড্রাইভার সেজে হাস্যকর কাণ্ড ঘটানো এক অধ্যাপকের ভূমিকায় ধর্মেন্দ্র দেখিয়েছেন তাঁর নিখুঁত কৌতুকাভিনয়। অমিতাভ-শর্মিলার সঙ্গে তাঁর কেমিস্ট্রি ছিল অতুলনীয়।
৫৯ টাকা থেকে ৬৫০ কোটির সম্পত্তি
মাত্র ৫১ রুপি (প্রায় ৬০ টাকা) পারিশ্রমিক নিয়ে ১৯৬০ সালের ‘দিল ভি তেরা, হাম ভি তেরে’ ছবিতে অভিনয়জীবন শুরু করেছিলেন ধর্মেন্দ্র। সেই বিনম্র শুরু থেকে ছয় দশকে তিনি হয়ে ওঠেন বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় এবং সফল নায়ক। শোলে, প্রতিজ্ঞা, সীতা অর গীতা, ধরম বীরসহ অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন তিনি। অভিনয়জীবনের পাশাপাশি তাঁর বাণিজ্যিক দূরদর্শিতা এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগই তাঁকে পরিণত করে বিপুল সম্পদের মালিকে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় ধর্মেন্দ্রর মোট সম্পত্তির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০০ কোটি রুপি। বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৬৫০ কোটি টাকা। এর বড় অংশই এসেছে মুম্বাইয়ের লোনাভালায় অবস্থিত তাঁর ১০০ একরের বিলাসবহুল ফার্মহাউস থেকে, যেখানে রয়েছে সুইমিংপুল, বাগান, থেরাপি এরিয়া এবং অত্যাধুনিক নানা সুযোগসুবিধা। মুম্বাইয়ের জুহুসহ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর আরও সম্পত্তি রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৭ কোটি রুপি (প্রায় ২২ কোটি টাকা)।শুধু অভিনয় নয়, ব্যবসাতেও তাঁর সমান দাপট ছিল। কর্নাল হাইওয়েতে তাঁর ‘গরম ধরম ধাবা’ এবং ‘হি-ম্যান রেস্তোরাঁ’ দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় ছিল, যেখান থেকে তিনি নিয়মিত আয় করতেন। এ ছাড়া ভারতের বিভিন্ন শহরে গরম ধরমের আরও আউটলেট ছিল। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁর প্রযোজনা সংস্থা বিজেতা ফিল্মস এবং ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট থেকেও তিনি উল্লেখযোগ্য আয়ের সূত্র তৈরি করেছিলেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে মাত্র ৫৯ টাকার যাত্রা শুরু করে শেষ পর্যন্ত ৬৫০ কোটির সাম্রাজ্য গড়ে গেছেন ধর্মেন্দ্র।
- বিষয় :
- ধর্মেন্দ্র
- মৃত্যু
- বলিউড অভিনেতা
