ভারতে দাঙ্গায় পড়ে ঢাকায় আসেন রাজ্জাক, এরপর যেভাবে নায়করাজ হয়ে ওঠেন
ছবি: সংগৃহীত
বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৪:৪৩ | আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৪:৪৬
ভারতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অন্ধকার পেরিয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সিনেমার নক্ষত্র। তিনি নায়করাজ রাজ্জাক। আজ ২৩ জানুয়ারি, এই কিংবদন্তি অভিনেতার ৭৪তম জন্মদিন।
১৯৬৪ সালে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয়ে রাজ্জাক পরিবার-পরিজন নিয়ে পাড়ি জমান ঢাকায়। অচেনা শহর, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে জীবনের শুরুটা ছিল কঠিন। কীভাবে জীবন চলবে, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন—এই দুশ্চিন্তাই তখন ঘিরে ধরেছিল তাঁকে।
কিন্তু অভিনয় ছিল তাঁর রক্তে-মাংসে মেশানো। অন্য কোনো পেশার প্রতি তেমন আগ্রহ না থাকায় শেষ পর্যন্ত সেই অভিনয়ই হয়ে ওঠে তাঁর আশ্রয়। ঢাকায় এসে পরিচালক কামাল আহমেদের সঙ্গে ‘উজালা’ চলচ্চিত্রে সহকারী হিসেবে কাজ করার মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর হাতে খড়ি। এখান থেকেই শুরু হয় এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়—যার নাম নায়করাজ।
কলকাতা থেকে মুম্বাই এরপর ঢাকা
১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন আব্দুর রাজ্জাক। অভিনয় জীবনের শুরুটা ছিল থিয়েটারের মঞ্চে। সিনেমার নায়ক হওয়ার অদম্য স্বপ্ন তাঁকে টেনে নেয় ভারতের মুম্বাইয়ে। ১৯৫৯ সালে তিনি ফিল্মালয় থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়াশোনা ও ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন।
পড়াশোনা শেষে কলকাতায় ফিরে ‘শিলালিপি’সহ আরও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। এরপর ৬০-এর দশকে ঢাকায় এসে সালাউদ্দিন পরিচালিত হাসির সিনেমা ‘তেরো নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’-এ পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ঢাকাই চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
‘বেহুলা’ থেকে নায়করাজ
নায়ক হিসেবে রাজ্জাকের প্রকৃত উত্থান ঘটে জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ৭০ ও ৮০-এর দশক—এই তিন দশকজুড়ে রাজ্জাক ছিলেন ঢাকাই সিনেমার অবিসংবাদিত নায়ক। তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষ প্রতীক।
স্মরণীয় সব চলচ্চিত্র
নায়করাজ অভিনীত দর্শকনন্দিত ছবির তালিকায় রয়েছে— ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘মধুমিলন’, ‘পিচঢালা পথ’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘অবুঝ মন’, ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’, ‘আলোর মিছিল’, ‘অশিক্ষিত’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বাদী থেকে বেগম’**সহ অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমা।
প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবেও রাজ্জাক
শুধু অভিনয় নয়, চলচ্চিত্র প্রযোজনাতেও নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন রাজ্জাক। প্রযোজক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ‘রংবাজ’ ছবিটি দিয়ে, পরিচালনায় ছিলেন জহিরুল হক। এতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন কবরী।পরবর্তীতে ববিতার সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘অনন্ত প্রেম’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন নায়করাজ। ছবিটি আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।নায়ক হিসেবে তাঁর সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিল শফিকুর রহমান পরিচালিত ‘মালামতি’, যেখানে তাঁর বিপরীতে ছিলেন নূতন। অন্যদিকে সর্বশেষ নির্মিত ছবি ছিল ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ‘আয়না কাহিনী’, যেখানে অভিনয় করেন সম্রাট ও কেয়া।
চিরসবুজ নায়ক
দাঙ্গার বিভীষিকা থেকে উঠে এসে যিনি হয়ে উঠেছিলেন কোটি দর্শকের ভালোবাসার মানুষ—তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি একটি অধ্যায়, একটি ইতিহাস। বাংলা সিনেমার আকাশে নায়করাজ আব্দুর রাজ্জাক তাই চিরকাল উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।
- বিষয় :
- নায়করাজ রাজ্জাক
- জন্মদিন
- স্মরণ
