‘বহুমাত্রিক ব্যাখ্যার সুযোগটুকুই আমি সচেতনভাবে রেখেছি’
মোস্তাফিজুর নূর ইমরান
বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:১০
মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। অভিনেতা ও নির্মাতা। সম্প্রতি ওটিটি মাধ্যম চরকিতে মুক্তি পেয়েছে তাঁর নির্মিত প্রথম ওয়েব সিনেমা ‘জ্বীনের বাচ্চা’। এই সিনেমা নিয়ে কথা হলো তাঁর সঙ্গে–
প্রায় দুই দশকের অভিনয়জীবন। হঠাৎ নির্মাণে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
‘হঠাৎ’ নয়। ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতিটা অনেক দিনের। ২০০০ সালে বাগেরহাট থিয়েটার দিয়ে আমার যাত্রা শুরু। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে পড়ার সময় নিয়মিত নির্দেশনা দিয়েছি। তখনই বুঝেছিলাম, নির্দেশনা দেওয়ার মধ্যে একধরনের তৃপ্তি আছে। এরপর অভিনয় করতে করতে বহু নির্মাতার সঙ্গে কাজ করেছি, ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার, চরিত্র নির্মাণের পদ্ধতি কাছ থেকে দেখেছি। এটি ঠিক অভিনয় আমাকে তৃপ্তি দিয়েছে। এটিই আমার ভিত্তি। কিন্তু ভেতরে সবসময়ই একটা অদম্য ক্ষুধা কাজ করেছে। আমি এটিকে বলি ‘স্টোরিটেলিং ক্রেভিং’। শুধু একটি চরিত্র হয়ে থাকা নয়, পুরো গল্পের জগৎটা নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষাই আমায় নির্মাণে আগ্রহী করেছে।
প্রথম কাজ হিসেবে ‘জ্বীনের বাচ্চা’। নামের মধ্যেই যেন রহস্য লুকিয়ে আছে…
নামটা ইচ্ছাকৃতভাবে দেওয়া। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে অজানা কিছু দেখলে তাকে অতিপ্রাকৃত বলে চালিয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু আমার নির্মিত ‘জ্বীনের বাচ্চা’ ভয়ের নয়; এটি মাতৃত্বের গল্প। সমাজের কুসংস্কার, অবহেলা, মানসিক নিঃসঙ্গতার ভেতর দিয়ে এক নারীর মনস্তাত্ত্বিক যাত্রা দেখানো হয়েছে। পরিচালক হিসেবে প্রথম কাজ শুরুর আগে অনেক গল্প নিয়ে ভেবেছি, অন্যদের কাছ থেকে গল্প শুনেছি, স্ক্রিপ্ট পড়েছি। নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দেওয়ার মতো গল্প পাচ্ছিলাম না। এরপর যখন ‘জ্বীনের বাচ্চা’র কাহিনি আমার সামনে আসে, তখনই অনুভব করি–এটি শুধু একটি গল্প নয়, বরং এক ধরনের মানসিক আর সামাজিক আর্তি। বলা যায় গল্পটার ভেতরে এমন এক নিঃশব্দ যন্ত্রণা ছিল, যা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। মনে হয়েছিল, এটিকে ফ্রেমবন্দি না করলে শান্তি পাব না।
এই গল্পে বাস্তব ও অবাস্তবের মিশেল কি সচেতনভাবেই করেছেন?
অবশ্যই সচেতনভাবে। আমরা সাধারণত বাস্তবতাকে খুব সরল, দৃশ্যমান এবং যুক্তিনির্ভর এক কাঠামোর মধ্যে ফেলে দেখি। একজন মানুষের মানসিক জগৎ তো সবসময় সেই দৃশ্যমান বাস্তবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষ করে যখন সে সামাজিক চাপ, একাকিত্ব কিংবা অপরাধবোধের ভেতর দিয়ে যায়। তখন তার ভেতরের বাস্তবতা অনেক সময় বাইরের বাস্তবতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ‘জ্বীনের বাচ্চা’তে গ্রামবাংলার পটভূমি ব্যবহার করেছি ঠিকই। এটি কেবল একটি গ্রামীণ জীবনচিত্র নয়। আমি চেয়েছি মানসিক বাস্তবতা আর সামাজিক বাস্তবতার মধ্যকার টানাপোড়েন দৃশ্যমান করতে; যাতে করে দর্শক যেন নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যার মধ্যে আটকে না যান; বরং নিজ নিজ অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস আর অনুভূতি দিয়ে গল্পটিকে ব্যাখ্যা করেন। কারণ আমার কাছে গল্পের অর্থ কখনোই একরৈখিক নয়। একই দৃশ্য একজনের কাছে অতিপ্রাকৃত মনে হতে পারে, আরেকজনের কাছে সেটি হতে পারে অন্যরকম। এই বহুমাত্রিক ব্যাখ্যার সুযোগটুকুই আমি সচেতনভাবে রেখেছি।
আপনি বলছেন এটি মূলত মাতৃত্বের গল্প। একটু ব্যাখ্যা করবেন?
আমাদের সমাজে মাতৃত্বকে যেমন সম্মান করা হয়, তেমনি বিচারও করা হয়। কোনো নারী যদি প্রচলিত ছকের বাইরে চলে যান, সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে। এই গল্পে দেখিয়েছি, একজন মায়ের অনুভূতি এই জগৎ বা অন্য কোনো জগৎ। সব জায়গায় এক। কিন্তু সেই অনুভূতির সঙ্গে যখন সামাজিক অপমান, কুসংস্কার আর একাকিত্ব যুক্ত হয়, তখন তার মানসিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? সেটিই অনুসন্ধান করেছি।
ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কাজের স্বাধীনতা কেমন?
ওটিটি মাধ্যমগুলো নির্মাতাদের সবচেয়ে বড় একটি সুবিধা দেয়। তা হলো বিষয় নির্বাচনে সাহসী হওয়ার সুযোগ। এখানে গল্পের গভীরতা নিয়ে কাজ করা যায়, সময় নিয়ে চরিত্র নির্মাণ করা যায়।; যা হয়তো প্রচলিত টেলিভিশন কাঠামোয় বলা কঠিন হতো।
তাহলে কী অভিনয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন?
না, একেবারেই না। অভিনয় আমার প্রথম প্রেম। তবে নির্মাণ আমাকে নতুন এক ভাষা দিয়েছে। দুটোই একসঙ্গে করতে চাই। সামনে আরও কিছু গল্প নিয়ে ভাবছি।
- বিষয় :
- মোস্তাফিজুর নূর ইমরান
