ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইতিহাসের পাতায় ওয়ারফেজ

ইতিহাসের পাতায় ওয়ারফেজ
×

ছবি-সংগৃহীত

ইলমা আজাদ

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৭:১৩ | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৭:২৫

কিছু প্রাপ্তি অবিশ্বাস্য মনে হয়। যা শুনে মন বারবার নিশ্চিত হতে চায়, সেই প্রাপ্তি বা অর্জন বিষয়টি আদৌ সত্যি কিনা। নিশ্চিত হলেও অনুভব হয়ে ওঠে ঘোর লাগা। ওয়ারফেজ সদস্যরা তেমনই এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন কদিন আগে; যেদিন প্রথম শুনতে চান, দেশের প্রথম ব্যান্ড হিসেবে তারা পাচ্ছেন ‘একুশে পদক ২০২৬’। 

দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা এটি, যা প্রথমবারের মতো কোনো ব্যান্ডের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। তাই এমন খবর কানে গেলে তা সত্যি, নাকি মিথ্যা– এ নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়। কিন্তু ঘোষণা যখন রাষ্ট্রের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আসে, তখন তো অবিশ্বাসের কিছু থাকে না। এক পর্যায়ে এই সম্মাননা কথা সত্য বলে মেনে নিয়েছেন ওয়ারফেজ সদস্যরা। কিন্তু উচ্ছ্বাস, উল্লাস, চিলচিৎকারে আকাশ-বাতাস একাকারে করে দেননি।

সব কিছুতেই পরিমিতি বোধ থাকতে হয়– এই কথাটা তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন সবাইকে। অবাক করা ঘটনা হলো, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির খবরটি যখন ওয়ারফেজ সদস্যদের কানে যায়, তখন তারা একটি শোর প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। তাই যে খবর কানে এলো, তা আদৌ সত্যি কিনা– শুরুতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছিল। এমন হওয়ারই কথা। দেশের প্রথম কোনো ব্যান্ড আগে কখনও এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। তাই এমন কিছুর প্রাপ্তি মানেই ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো। তার চেয়ে বড় বিষয় হলো– এই একুশে পদক হয়ে  উঠেছে দেশীয় ব্যান্ড সংগীতের উত্থানের স্মারক। কারণ তিন দশক আগেও দেশের প্রেক্ষাপট এমন ছিল না।

গানের ভুবনে দেশীয় ব্যান্ডগুলোর আধিপত্য শুরু হয় মূলত নব্বই দশকে। এই উত্থান ছিল চমকে দেওয়ার মতো। অথচ এর আগে ব্যান্ড সদস্যদের সংগীতচর্চাকে অপসংস্কৃতি বলে আখ্যা দিয়েছেন অনেকে। সেখান থেকে লড়াই অব্যাহত রেখে অভিনব সংগীতায়োজনের মধ্য দিয়ে শ্রোতার চিন্তাধারা বদলে দেওয়া সহজ নয়। ব্যান্ড আন্দোলনের সেই সময়ে ওয়ারফেজ সদস্যরাও ছিলেন সামনের সারিতে। অভিনব আয়োজনের মধ্য দিয়ে সব বাধা ডিঙিয়ে চলার পথকে করেছেন মসৃণ। তাইতো একুশে পদক পাওয়ার কথা শুনেই ওয়ারফেজ ব্যান্ডের দলনেতা ও ড্রামার শেখ মনিরুল আলম টিপু ঘোষণা দেন, এই অর্জন শুধু ওয়ারফেজ নয়, দেশের সব ব্যান্ডের। 

আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে একুশে পদক গ্রহণ করছেন ওয়ারফেজের টিপু।

তিনি আরও বলেন, ‘অপ্রত্যাশিত এই সংবাদে সত্যি ভাষাহীন। এই প্রাপ্তি ওয়ারফেজের এককভাবে নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে দেশের সব ব্যান্ডের বিজয়গাথা রচনা হলো। যেসব তরুণ আজ ব্যান্ড গড়ছে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তাদের উজ্জীবিত করবে এই স্বীকৃতি। আমরা কৃতজ্ঞ ওয়ারফেজের নতুন ও পুরোনো প্রত্যেক সদস্যের প্রতি। ধন্যবাদ জানাতে চাই, সরকার ও আমাদের সব দর্শক-শ্রোতার।’

ওয়ারফেজ লাইনআপ বদলেছে বহুবার। কিন্তু যারা ব্যান্ডকে সময় দিতে পারছেন না, তারা যে ওয়ারফেজের সঙ্গে সবরকম সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছেন– তা নয়। বরং যখনই যিনি সুযোগ পান, ব্যান্ডের কোনো না কোনো আয়োজনে অংশ নিয়ে থাকেন। এই যেমন গত বছর ‘অবাক ভালোবাসা’ গানটি নতুন সংগীতায়োজনে দর্শক-শ্রোতার কাছে তুলে ধরা হলো, তখন হঠাৎ করে দেখা মিলেছিল সাবেক বেস গিটারিস্ট ও কণ্ঠশিল্পী বাবনার। বিদেশ-বিভুঁই থাকার পরও এখনও যে তিনি নিজ ব্যান্ডকে সমান ভালোবাসেন, তার প্রমাণও মিলেছে ‘অবাক ভালোবাসা’ গানের রিমেকে।

একইভাবে ব্যান্ডের চার দশকপূর্তিসহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আয়োজনে দেখা মিলেছে সঞ্জয়, মিজান, বালাম, ইকবাল আসিফ জুয়েল, বেসবাবা সুমন, ফুয়াদসহ পুরোনো সদস্যদের। তাই একুশে পদকপ্রাপ্তিতে তেমনই এক উচ্ছ্বাসময় আয়োজনে শরিক হতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন দশকের পথচলার পুরোনো সারথিরা।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাবনা করিম আর মাসুক রহমান, কানাডা থেকে সঞ্জয়, কামরান রহমান  আর চীন থেকে ছুটে এসেছিলেন অনি হাসান। বাকি সদস্যদেরও চেষ্টার কমতি ছিল না। কিন্তু অনেক কিছুর পরও তারা উপস্থিত হতে পারেননি ওয়ারফেজদের এই বিজয়কাব্য রচনার মুহূর্তে। তবু শেষমেশ যাদের একসঙ্গে দেখা গেছে, তাদের দলটাও যে ছোটখাটো ছিল না– সে কথা স্বীকার করতেই হয়। 

নবীন-প্রবীণের মিলনমেলায় অতীত প্রসঙ্গে যে ঘুরেফিরে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই কথায় কথায় জন্মমুহূর্তের দিনগুলো যে স্মৃতিপটে ভেসে উঠবে– এও ছিল স্বাভাবিক। ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও লিড গিটারিস্ট ইব্রাহিম আহমেদ কমল বলেন, গানে গানে চার দশক পেরিয়ে আজকের এই দিনটি পর্যন্ত আসতে পারা– পুরোটাই কেন যেন স্বপ্নের মতো। মনে পর্দায় ভাসছে কৈশোরের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার সেই ক্ষণ। যখন আমরা কয়েকজন গানপাগল ছেলে নতুন কিছু করার স্বপ্নে বিভোর।

অবশেষে ১৯৮৪ সালে আমি, হেলাল, বাপ্পি, মীর আর নাঈমুল মিলে গড়ে তুলি মেটাল ঘরানার ব্যান্ড। সে বছর ৬ জুন, ‘ওয়ারফেজ’ নামে যার অভিষেক হয়। সেই শুরু। এর পর হার্ডরক আর হেভিমেটাল ঘরানার গান নিয়ে মেতে ওঠা। ইংরেজি বদলে এক সময় বাংলা গানের দিকে ঝুঁকে পড়া। এসবের মাঝেই পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কেউ ব্যান্ড ছেড়ে বিদেশে গিয়েছেন, কেউ গেছেন অন্য পথে। তবু নতুন নতুন গল্প রচনার আকাঙ্ক্ষায় নতুন লাইনআপ নিয়ে আমাদের যাত্রা ছিল অব্যাহত। আর সেই যাত্রা চলুক নিরন্তর– এটাই আমাদের চাওয়া। এমন চাওয়া শুধু কমল বা ওয়ারফেজের বাকি সদস্যের নয়, অগণিত সংগীতপ্রেমীর।

যাদের আজও গুনগুনিয়ে চলেছে ‘ওয়ারফেজ’ [স্বনামে প্রকাশিত/ ১৯৯১], ‘অবাক ভালোবাসা’ [১৯৯৪], ‘জীবনধারা’ [১৯৯৭], ‘অসামাজিক’ [১৯৯৮], ‘আলো’ [২০০০], ‘মহারাজ’ [২০০৩], ‘পথচলা’ [রিমেক ও নতুন গানের সংকলন/ ২০০৯], ‘সত্য’ [২০১২] অ্যালবামের গানগুলো। অবশ্য এর বাইরেও অনলাইন পাশাপাশি কয়েকটি মিশ্র অ্যালবামে গান প্রকাশ পেয়েছে দেশের শর্ষী রক-মেটাল ঘরানার এই ব্যান্ডের।

একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘একুশে পদক ২০২৬’ পেল ওয়ারফেজ, তেমনি চার দশকের মাইলফলকের স্পর্শের আয়োজনও চলছে জোরেশোরে। অবশ্য দুই বছর আগেই ৪০ বছর পূর্ণ হয়েছে এই ব্যান্ডের। তবে এ উপলক্ষে দেশ-বিদেশের ধারাবাহিক কনসার্ট পর্ব শুরু হয়েছিল, তা এখনও থেমে যায়নি। কারণ জনপ্রিয়তা ধরে রেখে দীর্ঘ এই সংগীত সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে চান ওয়ারফেজ সদস্যরা। সে লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে কনসার্টের পাশাপাশি অ্যালবাম ও স্যুভেনির প্রকাশনা ছাড়াও বর্ণাঢ্য আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে।

শেখ মনিরুল আলম টিপুর কথায়, ‘গানে গানে ওয়ারফেজ ৪০ বছরের পথ অতিক্রম করেছে– এটি একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনই বিস্ময়েরও। কেননা, সংগীতের মান ধরে রেখে এতটা পথ পাড়ি দেওয়া মোটেও সহজ নয়। বিশেষ করে, যে দেশে ব্যান্ড সংগীতের প্রতিষ্ঠার জন্য একটা সময় রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়েছে। নিরীক্ষা আর অনবদ্য আয়োজন দিয়েই শ্রোতার মনে জায়গা করে নিয়েছে ওয়ারফেজ। শ্রোতাদের ভালোবাসা ছিল এতটা পথ পাড়ি দেওয়ার অনুপ্রেরণা।’
 

আরও পড়ুন

×