বেগুনি আলোয় মঞ্চে ফিরল বিটিএস
ছবি: বিবিসি
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২৬ | ২১:৪৬ | আপডেট: ২৩ মার্চ ২০২৬ | ১১:৪২
শনিবারের পড়ন্ত বিকেল। সিউলের হৃদয়খ্যাত ‘গিয়াংঘোয়ামুন স্কয়ার’ সাক্ষী হলো এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের। চারপাশে শুধুই গাঢ় বেগুনি রঙ, বিশ্বখ্যাত পপ ব্যান্ড বিটিএস-এর 'সিগনেচার কালার'। উচু ভবনে ডিজিটাল পর্দা, রাস্তার ধারের বিলবোর্ড, এমনকি সেভেন-ইলেভেন স্টোরের ব্যানারেও লেখা 'ওয়েলকাম ব্যাক বিটিএস'।
দীর্ঘ তিন বছরের বিরতি কাটিয়ে আবারও মঞ্চে জনপ্রিয় মিউজিক ব্যান্ড বিটিএস। আর তাদের বরণ করতে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল রূপ নিল বিশাল উন্মুক্ত এক মঞ্চে।
বিটিএসের সাত সদস্য আরএম, জিন, সুগা, জে-হোপ, জিমিন, ভি এবং জংকুক মঞ্চে আসার অনেক আগে থেকে সিউলের অলিগলি ছিল ‘আর্মি’দের (বিটিএস ভক্ত) দখলে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ভেরোনিকা ও আমান্ডা জানান, এই তিন বছর তাদের জন্য ছিল এক দীর্ঘ লড়াই। আমান্ডা বলেন, 'বিটিএস আমাদের কাছে শুধু একটি ব্যান্ড নয়, আমাদের জীবনের অংশ।' ভক্তদের হাতে হাজার হাজার ‘লাইট-স্টিক’ আর ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান পোশাক ‘হানবক’ প্রমাণ দিচ্ছিল, এই প্রত্যাবর্তন শুধু গানের নয়, বরং এক আবেগের।
সূর্য যখন মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখন হাজার হাজার ভক্তের চিৎকারে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গিয়াংঘোয়ামুন স্কয়ার। হঠাৎ সব শব্দ ছাপিয়ে বেজে ওঠে ঐতিহাসিক ‘ডিভাইন বেল’। বিটিএসের নতুন অ্যালবাম ‘আরিরং’-এর ‘নাম্বার ২৯’ ট্র্যাক দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। ব্যান্ডের লিডার আরএম কোরিয়ান ভাষায় ভক্তদের অভিনন্দন জানিয়ে ইংরেজিতে ঘোষণা করেন 'উই আর ব্যাক'।

বিজয় তোরণের মতো সাজানো মঞ্চে উঠে অ্যালবামের প্রথম পূর্ণাঙ্গ গান ‘বডি টু বডি’ গাওয়া শুরু করেন বিটিএস সদস্যরা। কোরিয়ার লোকগান ‘আরিরং’-এর সুরের সঙ্গে আধুনিক পপ মিশ্রণ যেন ভক্তদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। নতুন গানের পাশাপাশি ‘বাটার’, ‘ডাইনামাইট’ ও ‘মিক্রোকোসমস’-এর মতো হিট গান যখন বাজছিল, তখন হাজার হাজার লাইট-স্টিকের আলোয় পুরো চত্বর যেন জীবন্ত এক নক্ষত্র।
বিটিএসের এই আয়োজন কেবল একটি কনসার্ট ছিল না, ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সফট পাওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক শক্তির প্রদর্শনী। সিউলের ঐতিহাসিক স্থানে এমন আয়োজন সম্পর্কে সুগা বলেন, 'আমাদের পরিচয় বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতেই গিয়াংঘোয়ামুন বেছে নিয়েছি।'
তবে এই বিশাল আয়োজন ঘিরে কিছু সমালোচনাও দানা বেঁধেছে। শহরের কেন্দ্রস্থল স্থবির করে দেওয়া, কয়েক হাজার পুলিশ ও দমকল কর্মী মোতায়েন এবং বিপুল সরকারি সম্পদ ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বিশেষ করে অনুষ্ঠানটি যখন কেবল নেটফ্লিক্সে লাইভ স্ট্রিম হচ্ছিল, তখন জনসাধারণের জায়গা এভাবে ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন সংগীত সমালোচক জং মিন-জে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভবিষ্যতে অন্য কোনো শিল্পী এমন সুযোগ চাইলে সরকার কী মানদণ্ডে তা বিচার করবে?
দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন
দক্ষিণ কোরিয়ার আইন অনুযায়ী প্রত্যেক সাবালক পুরুষকে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা দিতে হয়। সে আইন মেনে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন বিটিএস সদস্য জিন। পর্যায়ক্রমে অন্য ছয় সদস্যকেও রণক্ষেত্রে যেতে হয়। সে কারণেই তিন বছরের বিরতি। এই সময়ে তারা একক অ্যালবাম প্রকাশ করলেও পূর্ণাঙ্গ ব্যান্ড হিসেবে কোনো কনসার্ট বা স্টুডিও অ্যালবাম করেননি। দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন ও সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ অবশেষে মঞ্চে ফিরলেন তারা।

কিংবদন্তির পথে বিটিএস
সমালোচনা ছাপিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার এই আয়োজনকে সমর্থন করেছে। ২০১৩ সালে অভিষেকের পর থেকে বিটিএস কেবল বিলবোর্ড চার্ট দখল করেনি, পৌঁছে গেছে জাতিসংঘ ও হোয়াইট হাউজ পর্যন্ত। সংগীত সমালোচক লিম হি-ইউনের মতে, বিটিএসের এই জনপ্রিয়তা অনেকটা ষাটের দশকের ‘দ্য বিটলস’- এর মতো। তিনি বলেন, 'যখন আমরা দেখি হাজার হাজার নীল চোখের পশ্চিমা কোরিয়ান ভাষায় গান গেয়ে কাঁদছেন, তখন আমাদের গর্ব অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়।'
ধারণা করা হয়েছিল ‘গিয়াংঘোয়ামুন স্কয়ারের’ অনুষ্ঠানে আড়াই লাখ মানুষ আসবে। কিন্তু বাস্তবে উপস্থিতি ছিল কয়েক হাজার। তবে সংখ্যার চেয়ে বড় ছিল তাদের উন্মাদনা। পাহাড়বেষ্টিত সিউলে বিটিএসের এই পারফরম্যান্স দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যান্ডের ইমেজ আবার বিশ্ব দরবারে তুলে ধরল।
সিউলের আকাশে ড্রোনের আলোয় যখন বিটিএস লোগো ফুটে উঠছিল, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, তিন বছরের অনুপস্থিতি বিটিএসের প্রতি ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র চির ধরাতে পারেনি। সূত্র: বিবিস
- বিষয় :
- বিটিএস
