ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

অস্ত্রোপচারে সঙ্গীতের ব্যবহারে ওষুধ লাগে কম: গবেষণার তথ্য

অস্ত্রোপচারে সঙ্গীতের ব্যবহারে ওষুধ লাগে কম: গবেষণার তথ্য
×

ভারতে অস্ত্রোপচারের সময় এক রোগীর কানে বাজানো হয় বাঁশির সুর। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

বিবিসি

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১৮:০১ | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১৮:০৭

ভারতের নয়াদিল্লির একটি হাসপাতালে রোগীকে অচেতন করে চলছিল অস্ত্রোপচার। চিকিৎসকরা তার পিত্তথলি অপসারণ করছিলেন। রোগীর কানে লাগানো হেডফোনে তখন মৃদু শব্দে বাজছিল বাঁশির সুর।

ওই অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে সাধারণ চেতনানাশক দেওয়া হয়েছিল। এতে তাঁর মস্তিষ্ক কিছুটা নিস্তেজ হলেও শ্রবণশক্তি সক্রিয় ছিল। চিকিৎসকরা বলছেন, অস্ত্রোপচারের সময় সঙ্গীত না শোনা রোগীর তুলনায় সঙ্গীত শোনা রোগীর জ্ঞান ফেরাতে কম মাত্রার ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়েছে।

দিল্লির মাওলানা আজাদ মেডিকেল কলেজ ও লোক নায়ক হাসপাতালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, অ্যানাস্থেসিয়ার সময় সঙ্গীত বাজালে রোগীর কম মাত্রার ওষুধের প্রয়োজন হয়। এটি জ্ঞান ফেরানোর কাজেও কিছুটা ভূমিকা রাখে। 

মিউজিক অ্যান্ড মেডিসিন নামের একটি জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশ হয়েছে। এটি কেবল পিত্তথলি অপসারণের মতো অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে। এ ধরনের অস্ত্রোপচারে সাধারণত এক ঘণ্টার কম সময় লাগে। 

অস্ত্রোপচারের সময় গবেষকরা সঙ্গীতের দিকে কেন ঝুঁকলেন, তা জানার জন্য অ্যানাস্থেসিয়ার আধুনিক চর্চা বোঝা জরুরি। অ্যানাস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ ও স্বীকৃত মিউজিক থেরাপিস্ট ফারাহ হুসাইন বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে দ্রুত হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া। এর জন্য রোগীর জ্ঞান ফেরার প্রক্রিয়ায় সচেতন ও ব্যথামুক্ত থাকাটা জরুরি। 

রোগীর জ্ঞান ফেরার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে চাইলে, অ্যানেস্থেসিয়ার সময়ই পাঁচ থেকে ছয়টি ওষুধের মধ্যে সমন্বয় রাখতে হবে। যাতে তা রোগীকে ঘুমিয়ে রাখে, ব্যথা অনুভব করতে না দেয় এবং পেশী শিথিল রাখে। ফারাহ হুসাইন বলেন, ল্যাপারোস্কোপিক পিত্তথলি অপসারণের প্রক্রিয়ায়, অ্যানাস্থেসিয়োলজিস্টরা (অবেদনবিদ) এখন প্রায়ই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন। তারা শুধু পেটের নির্দিষ্ট অংশের স্নায়ুগুলো অবশ করেন। 

মাওলানা আজাদ মেডিকেল কলেজের গবেষক তানভি গোয়েল বলেন, সাধারণ অ্যানেস্থেসিয়া ও নির্দিষ্ট অংশ অবশ করার চল দীর্ঘদিনের। কিন্তু শরীর সহজে সার্জারির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না। অবশ অবস্থাতেও হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়, স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়ে, রক্তচাপ উর্ধ্বমুখী হয়। ফারাহ হুসাইন বলেন, এই প্রতিক্রিয়াগুলো জ্ঞান ফেরাকে দীর্ঘায়িত করে, শরীরে প্রদাহ বাড়ায়।

এ অবস্থায় গবেষকরা ওষুধের প্রয়োজনীয়তা কমানোর উপায় খুঁজতে চান। কারণ, কম ওষুধ মানেই দ্রুত সজাগ হওয়া এবং স্বল্প পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তারা প্রথমে ৫৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ওপর ১১ মাস ধরে পরীক্ষা চালান। এসব রোগীদের দুটি দলে ভাগ করে একই মাত্রায় প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়। দুই দলের রোগীদের হেডফোন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের সময় কেবল এক দলের রোগীদের কানে সঙ্গীত বাজানো হয়। ফারাহ হুসাইন বলেন, এর ফলাফল ছিল চমকপ্রদ।

সঙ্গীত শোনানো রোগীদের জ্ঞান ফেরানোর প্রক্রিয়ায় প্রোপোফল ও ফেন্টানিলের মতো ওষুধের কম ব্যবহার করতে হয়। জ্ঞান ফেরাটাও বেশ মসৃণ ছিল। তাদের স্ট্রেস হরমোন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ছিল। জার্নালে গবেষকরা লিখেছেন, অ্যানাস্থেসিয়ার সময় শ্রবণ ক্ষমতা অক্ষুন্ন থাকে। তাই সঙ্গীত মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

চিকিৎসা ব্যবস্থায় মিউজিক থেরাপি নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগ, স্ট্রোক পুনর্বাসন ও প্যালিয়েটিভ কেয়ারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে অ্যানাস্থেসিয়ার ক্ষেত্রে এর ব্যবহার একটি নীরব পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

×