ইনসুলিন বন্ধের পরামর্শে রোগীর মৃত্যু, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি
ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও তদন্ত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:২৫
ইনসুলিন বন্ধ করে ‘কিটো ডায়েট’ ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ দেওয়ার পর এক ডায়াবেটিস রোগীর মৃত্যুর অভিযোগের তদন্তে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে অননুমোদিত সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগও তদন্ত করবে কমিটি। এর মধ্যে ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের প্রতিষ্ঠান হেলথ রেভুলেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা) অধ্যাপক ডা. মো. নুরুল ইসলামের সই করা এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ গত ৫ মে অপচিকিৎসা প্রদান ও অননুমোদিত সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদের অভিযোগে বলা হয়েছে, সুমি বেগম নামের ৩৬ বছর বয়সী ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি নিয়মিত ইনসুলিন ব্যবহার করতেন। পরে অনলাইনের মাধ্যমে হেলথ রেভুলেশন লিমিটেডের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি তাকে ইনসুলিন বন্ধ করে নির্দিষ্ট শর্করাবিহীন খাদ্যতালিকা অনুসরণ এবং উচ্চমূল্যের কিছু সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ দেয়। ওই পরামর্শ অনুসরণ করে ইনসুলিন বন্ধ করার পর তার ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। পরে তিনি সিভিয়ার ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসে (ডিকেএ) আক্রান্ত হন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢামেক হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ইনসুলিন বন্ধের পরামর্শ, কিটো ডায়েট ও সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের পরামর্শের সঙ্গে রোগীর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা) অধ্যাপক ডা. মো. নুরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘যে কোনো অভিযোগ এলে তা আমলে নেওয়া আমাদের কর্তব্য। যেহেতু ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, এটিও তদন্ত হবে। এই অভিযোগ তদন্তে আমরা কমিটি গঠন করেছি। এছাড়া অননুমোদিত সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারসহ অভিযোগগুলো তদন্ত করবে কমিটি। কমিটিকে অভিযোগের বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামতসহ ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির-উজ-জামানকে। সদস্যসচিব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (হাসপাতাল-১) ডা. মো. মাহমুদুর রহমান।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম এ হালিম খান, ঢামেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুরজাহান বানু এবং বারডেম হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আজিমুন্নেছা শিউলী।
কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সদস্যসচিব ডা. মো. মাহমুদুর রহমান।
কমিটির আহ্বায়ক ডা. মোহাম্মদ মনির-উজ-জামান বলেন, ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে। তবে তদন্ত কমিটি গঠনের চিঠি তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পাননি। ঢামেক হাসপাতালের অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদও অধিদপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, তার প্রতিষ্ঠান হেলথ রেভুলেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হলে অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। তিনি বলেন, এমন অভিযোগ পাওয়ার পর তারাও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তদন্ত করেছেন। তবে তাদের তদন্তে অভিযোগগুলোর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
ডা. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, মূলত চারটি বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি কিটো ডায়েটসংক্রান্ত। তবে তাদের তদন্তে দেখা গেছে, রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ভাত খাওয়ার কথা উল্লেখ ছিল।
ইনসুলিন বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, রোগী তাদের কাছে আসার আগ থেকেই ইনসুলিন ব্যবহার করতেন না। ফলে তাদের পরামর্শে ইনসুলিন বন্ধ করার অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। উচ্চমূল্যের সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার অভিযোগও সঠিক নয় বলে দাবি করেন ডা. জাহাঙ্গীর কবির।