সমকাল এক্সপ্লেইনার
আরব ন্যাটো: মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সামরিক জোট কীভাবে গঠন হবে
আরব ন্যাটো গঠনের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছে মিশর। সেনা সরবরাহও করতে চায় তারা। ছবি: এএফপি
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৬:১০ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:৩২
হামাসের নেতাদের লক্ষ্য করে কাতারের রাজধানী দোহায় গত মঙ্গলবার হামলা চালায় ইসরায়েল। এই হামলাই যেন ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের এক শঙ্কাকে বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছে। সেটি হলো- আরব সামরিক জোটের জন্ম।
ইসরায়েলের হামলার চারদিন পর গত রোববার দোহায় শুরু হয় আরব লীগ ও ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) জরুরি সম্মেলন। সোমবার সেখানে ইউরোপের ন্যাটোর আদলে একটি সামরিক জোট গঠনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, নতুন উদ্যোগ কতটা আলোর মুখ দেখবে? এখন কেন এই সামরিক জোট গঠনের প্রয়োজন হলো এবং যে পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ দরকার সেটি আসবে কোথায় থেকে?
সোমবারের বৈঠকে আরেকটি বিষয়ে একমত হয়েছেন আরব দেশের নেতারা। সেটি হলো- ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সংঘাত শুরুর পর হামাস-ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে কাতার। দোহায় হামলার পর এখন তাদের ভূমিকা কেমন হবে?
কেন প্রয়োজন হলো
মূলত দোহায় হামাসের হামলার পরই এই জোটের প্রসঙ্গ আলোচনায় এলো। ফলে বুঝতে বাকি থাকে না যে, গত মঙ্গলবারের ইসরায়েলের হামলা এবার আরব নেতাদের স্বার্থে আঘাত করেছে।

জোট গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সম্মেলনে নেতাদের দেওয়া বক্তব্যেই অনেকটা স্পষ্ট। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি বলেন, আলোচনায় বসা কাউকে যখন কেউ হত্যা করতে চায়- তখন বুঝতে হবে, এখানে আলোচনার আর কিছু নেই। হামলাকারীর উদ্দেশ্যই হলো যুদ্ধবিরতির আলোচনাকে ব্যাহত করা।
শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি আরও বলেন, নেতানিয়াহু আরব অঞ্চলকে ইসরায়েলের প্রভাবের ক্ষেত্র হিসেবে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি মূলত একটি ভ্রমের মধ্যে আছেন। যেটি তাঁর জন্য খুবই বিপজ্জনক।
বৈঠকে এরপর জোটের প্রসঙ্গ আনেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। তিনি বলেন, বর্তমানে যা ঘটছে তা এ অঞ্চলের (আরব) শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। আপনার (শেখ তামিম) ও জনগণের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। বিদ্যমান কিংবা ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তি চুক্তির সম্ভাবনাকেও বাধাগ্রস্ত করছে।
এ সময় পারমাণবিক সক্ষমতার দেশ পাকিস্তান একটি যৌথ টাস্ক ফোর্স গঠনের আহ্বান জানায়। এই টাস্ক ফোর্স ইসরায়েলের কৌশল পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রয়োজনে সমন্বিতভাবে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার বলেন, ইসলামিক দেশগুলোর ওপর আক্রমণ ও নিরপরাধ মানুষ হত্যার জন্য ইসরায়েলকে আর ছাড় দেওয়া উচিত হবে না।
আর বৈঠক শেষে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সব দেশ কাতারের পাশে আছে।
সম্মেলনে প্রায় ৬০টি দেশের নেতারা অংশ নেন। তাদের মধ্যে আরও ছিলেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি ও ইরানের প্রেসিডেন্টে মাসুদ পেজেশকিয়ান।
ন্যাটো কী
উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট (ন্যাটো) হলো ৩২ সদস্যের একটি সামরিক জোট। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া এই জোটের সদস্য রাষ্ট্রের বেশিরভাগই ইউরোপ মহাদেশের। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রের মধ্যে কেবল তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য।

বলা হয়ে থাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের হুমকি মোকাবিলায় ১৯৪৯ সালে ন্যাটো গঠন করা হয়। জোটের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এ কথা আংশিক সত্য। বাস্তবে এই জোট গঠনের উদ্দেশ্য আরও বিস্তৃত। এটি সোভিয়েতের সম্প্রসারণবাদ রোধের পাশাপাশি ইউরোপীয় রাজনৈতিক সংহতি উৎসাহিত করতে চেয়েছে।
ন্যাটোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর আর্টিকেল-পাঁচ। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ মানে সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। তখন সব সদস্য মিলে আক্রমণ প্রতিহতে কাজ করবে।
আরব ন্যাটো যেমন হবে
সম্মেলনে মিশরের পক্ষ থেকেই আরব ন্যাটো গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। আরব বিশ্বের মধ্যে এই দেশটির সেনাবাহিনীই সবচেয়ে বড়।
সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন এমন সূত্রের বরাত দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের গণমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল বলছে, একটি সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে মোট কমান্ডারের পাশাপাশি, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর একজনকে চিফ অব স্টাফ হিসেবে নির্বাচন করা হবে। এছাড়াও একটি পরিকল্পনা কাউন্সিল থাকবে। যেটি প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহে সমন্বয়ের বিষয়টি দেখভাল করবে।

বাহিনীতে প্রতিটি দেশের অবদান তাদের সামরিক ক্ষমতা এবং সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হবে। যুদ্ধ বা শান্তি রক্ষার মিশনে বাহিনী ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করতে হবে। এরপর অংশগ্রহণকারী দেশের সঙ্গে পরামর্শের পর কমান্ডার ও চিফ অব স্টাফ অনুমোদন দেবেন।
সম্মেলনের একটি সূত্র আরও জানিয়েছে, এই বাহিনী নিরাপত্তা হুমকি ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম মোকাবিলা করবে। যে কেউ আরব বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম মাআন এর বরাত দিয়ে জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, আরব ন্যাটোতে প্রায় ২০ হাজার সৈন্য দিয়ে অবদান রাখতে চায় মিশর। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মিশরের সেনাবাহিনীর একজন চার তারকা মর্যাদার কর্মকর্তাকে কমান্ডে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। এই ন্যাটোতে সৌদি আরবকে মূল সহযোগী হিসেবে ধরা হচ্ছে। এ নিয়ে আলোচনা চলমান।
অস্ত্র আসবে কোথায় থেকে
আরব ন্যাটোর সম্ভাব্য রূপরেখার মধ্যে একটি হলো অস্ত্র সরবরাহ সমন্বয়। যদিও আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে, তবে এ ধরনের জোট গঠন হলে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পশ্চিমা সরবরাহকারীদের থেকে সরিয়ে আনতে পারে। সুযোগ তৈরি হতে পারে চীনের। কারণ, গত কয়েক বছর ধরেই চীনের অস্ত্র প্রস্তুতকারকরা আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বিক্রি করছে।
সুইডেনের স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) গত এপ্রিলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে চীনা অস্ত্র রপ্তানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে পাইলটবিহীন যান (ইউএভি) ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ক্ষেত্রে।

কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনা অস্ত্রের খরচ তুলনামূলকভাবে কম এবং দ্রুত সরবরাহ করে। এ ছাড়া, মার্কিন বা ইউরোপীয় সরবরাহকারীদের তুলনায় চীনের অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের ওপর রাজনৈতিক বিধিনিষেধ কম।
আরব লীগের সদস্য কারা
উত্তর আফ্রিকা থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ২২টি দেশ নিয়ে গঠিত এই সংগঠন। এটি মূলত আরব-অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এর সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৫০ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ।
১৯৪৫ সালের ২২ মার্চ কায়রোতে প্রতিষ্ঠার সময় এর সদস্য ছিল সাতটি- মিশর, ইরাক, ট্রান্সজর্ডান (বর্তমানে জর্ডান), লেবানন, সৌদি আরব, সিরিয়া ও ইয়েমেন। বর্তমানে এর সদস্য দেশ ২২টি। আরব লীগের সদস্য দেশগুলো ৫৭ সদস্যবিশিষ্ট ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থারও (ওআইসি) সদস্য। এর মধ্যে বাংলাদেশও আছে।
ইতিহাস কী বলে
এ ধরনের সামরিক জোট গঠনের বিষয়ে ২০১৫ সালেও আলোচনা শুরু হয়েছিল। সেবারও প্রস্তাব দিয়েছিল মিশর। আরব লীগের সদস্যরা তাতে সম্মতিও দিয়েছিল। কিন্তু পরের বৈঠকগুলোতে এ নিয়ে আর আলোচনা আগায়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত দ্য ন্যাশনাল বলছে, জোটের গঠন কাঠামো ও সদরদপ্তর নিয়ে মতপার্থক্য, পারস্পরিক স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে তখন ‘আরব ন্যাটো’ আলোর মুখ দেখেনি।
