ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির পথে স্পেন, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেন: ইমানুয়েল মাখোঁ
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিসংঘের শীর্ষ সম্মেলনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ (ছবি-এএফপি)
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৩:২০ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৩:৪৪
ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে ফ্রান্সসহ আরও সাত দেশ। সোমবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশন শুরুর আগে এক দিনের বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে এ স্বীকৃতির কথা ঘোষণা করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। এ সময় তিনি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দানকারী দেশের তালিকায় অ্যান্ডোরা, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, মনোকো এবং সান মারিনোর নাম ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আমরা আর দেরি করতে পারি না। ফিলিস্তিনে শান্তি ফেরানোর সময় এখনই। দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে সম্মেলনটির আয়োজন করা হয়। মাখোঁ আরও বলেন, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে এবং সুইডেন একই পথে চলছে। এর আগে রোববার ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ঘোষণা দেয় যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগাল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যের মধ্যে চার দেশের কাছ থেকেই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেল ফিলিস্তিন। ১৯৮৮ সালে নিরাপত্তা পরিষদের দুই সদস্য রাশিয়া ও চীন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছিল। একই বছরে বাংলাদেশও স্বীকৃতি দেয়।
সোমবার জি-৭ জোটের সদস্য ইতালিতেও ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। নাগরিকরা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির জন্য দেশটির সরকারকে চাপে রেখেছে। ফ্রান্সসহ শিল্পোন্নত জোটের তিনটি দেশই ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র দেখতে চায়। জোটটির অন্য চারটি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি ও ইতালি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশন শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। চলবে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
সোমবার জাতিসংঘে ওই বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করে ফ্রান্স ও সৌদি আরব। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সরাসরি উপস্থিত থাকলেও সৌদি প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমান ভার্চুয়ালি যোগ দেন। দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে যোগ দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি অর্থাৎ ১৫৮টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লুক্সন বলেছেন, তাঁর দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তবে চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে।
জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন এই পদক্ষেপকে ‘সার্কাস’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ ‘সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করে। এর আগে নেতানিয়াহু চার দেশের স্বীকৃতির পর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ফিলিস্তিন কোনো রাষ্ট্র হবে না।
এদিকে সোমবার মধ্য লন্ডনে ফিলিস্তিন দূতাবাসের বাইরে ফিলিস্তিনি পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে, যা যুক্তরাজ্যের স্বীকৃতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটিতে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত হুসাম জোমলট যুক্তরাজ্যের ঘোষণার পর ভাষণ দেন। এর পরই দূতাবাসে পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা আগে ফিলিস্তিন মিশন নামে পরিচিত ছিল।
স্বীকৃতির প্রতিশোধ নিতে যা ভাবছে ইসরায়েল
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি বাড়তে থাকায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, তাঁর অতি-ডানপন্থি সরকার স্বীকৃতির প্রতিক্রিয়ায় অধিকৃত পশ্চিম তীরের আংশিক বা সম্পূর্ণ অংশ ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তির কথা বিবেচনা করছে। তবে এই সংযুক্তি বাস্তবায়নে নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন লাগবে। মনে করা হচ্ছে, জাতিসংঘ সম্মেলনে তিনি ওই সমর্থন আদায় করে নেবেন। ইসরায়েলি কূটনীতিকরা ফ্রান্স ও মাখোঁর বিরুদ্ধে বিশেষভাবে সম্ভাব্য ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেছেন। তারা জেরুজালেমে ফরাসি কনস্যুলেট বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছেন।
বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া
মধ্যপ্রাচ্য শান্তির জন্য দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, আমরা দ্বিরাষ্ট্র পদ্ধতির ভিত্তিতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলি সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অবস্থানের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়াই সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের একমাত্র উপায়। ফিলিস্তিনের স্বীকৃতিকে স্বাগত জানিয়েছে কাতার। আমিরাত বলেছে, এই ধরনের পদক্ষেপ আব্রাহাম চুক্তির চেতনাকে ক্ষুণ্ন করবে। ইতালি জানায়, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির পদক্ষেপ ইউরোপে ‘প্রতিকূল’ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। জার্মানি মনে করে, স্বীকৃতির বিষয়টি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানে পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য সম্ভাব্য প্রতিফল সম্পর্কে সতর্ক করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, স্বীকৃতির ব্যাপারে দেশগুলোর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট একমত নন। তবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার সরাসরি পশ্চিম তীর সংযুক্তির পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াদেফুল বলেন, দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানই হলো সেই পথ, যা ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করবে।
দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান কী
দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান হলো ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত একটি পদ্ধতি। এটি পশ্চিম তীর ও গাজায় একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রস্তাব করে। যাতে পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং দেশটি ইসরায়েলের পাশাপাশি থাকবে।
ইসরায়েল দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান প্রত্যাখ্যান করে। হামাস ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গ্রহণ করতে পারে। তা হবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দিয়েই।
ফিলিস্তিনের বাস্তবতা কি বদলাবে
ফ্রাঙ্কো-ব্রিটিশ আইন অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডস নিউইয়র্ক টাইমসে লেখেন, স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র তৈরি হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র বাদে প্রধান বিশ্বশক্তিগুলোর স্বীকৃতি মূলত প্রতীকী। তবে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকায় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
ফরেনসিক আর্কিটেকচার এবং বেলিংক্যাট অন প্যালেস্টাইন অ্যান্ড ইসরায়েলের তদন্তে অবদান রাখা ফ্রিল্যান্স গবেষক ক্রিস ওসিয়েক বলেন, যতক্ষণ না অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কিংবা ফিলিস্তিনে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের মতো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত হতাশা কাটবে না।
