ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

হামাস-ইসরায়েলের মুক্তি দেওয়া ব্যক্তিরা কারা, কোথায় বন্দি ছিলেন

হামাস-ইসরায়েলের মুক্তি দেওয়া ব্যক্তিরা কারা, কোথায় বন্দি ছিলেন
×

ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তির পর স্বজনদের উদ্দেশে বিজয় চিহ্ন দেখান এক ব্যক্তি। সোমবার পশ্চিম তীরের রামাল্লায়। ছবি: এএফপি

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:১৬ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:১৯

যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি দেবে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাস। এই ৭২ ঘণ্টা শেষ হয় আজ সোমবার দুপুরে। মুক্তিও পেয়েছেন জীবিত ২০ জিম্মি। 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর মোট ৪৮ ইসরায়েলিকে জিম্মি করেছিল হামাস। তাদের মধ্যে বাকি ২৮ জনকে মৃত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী, মৃতদেহও ফেরত দিতে হবে হামাসকে। তবে এ প্রক্রিয়া কখন শুরু হবে তা স্পষ্ট নয়। 

এর মধ্যেই যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, আটক ও কারাবন্দি প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিচ্ছে ইসরায়েল। জিম্মি ও বন্দি বিনিময়ের মুহুর্তে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষকে উল্লাস করতে দেখা গেছে। ইসরায়েল সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ঘোষণা দিয়েছেন ‘ওয়ার ইজ ওভার’ বা যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

গত মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র গাজায় যুদ্ধ বন্ধে যে ২০ দফা তুলে ধরে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল জিম্মি ও বন্দি বিনিময়। এটি পূরণ হওয়ায় এখন মিশরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে। এতে অন্তত ২০টি দেশের নেতারা উপস্থিত থাকবেন। যেটিকে বলা হচ্ছে শীর্ষ শান্তি সম্মেলন।

মুক্তিপ্রাপ্তরা কারা
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইসরায়েলি জিম্মিদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। তারা গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দি অবস্থায় ছিলেন। মুক্তি দেওয়ার সময় সোমবার তাদের গাজা উপত্যকার বাইরে একটি সামরিক ঘাঁটিতে আনা হয়। পরে অনেককে চিকিৎসার জন্য ইসরায়েলের বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

গত দুই বছরের প্রায় পুরো সময়ই এই জিম্মিরা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলোতে কাটিয়েছেন। যেখানে খাবার ও পানির অভাব ছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হাতে আটকের সময় তাদের অনেকে আহত হলেও যথেষ্ট চিকিৎসা সেবা পাননি।

জিম্মিদশা থেকে মুক্তির পর স্বজনের কাছে ফেরা এক ইসরায়েলি (বাঁয়ে)। ছবি: এএফপি

যেসব ইসরায়েলি জিম্মি মুক্তি পেলেন তাদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে জেরুজালেম পোস্ট। সেখানে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগকেই দক্ষিণ ইসরায়েলের ‘নোভা মিউজিক ফেস্ট’ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা সীমান্ত থেকে ইসরায়েলে শতাধিক রকেট হামলা চালায় হামাস। নোভা ফেস্টিভালে উচ্চ শব্দে গান বাজানোয় অনেকেই বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাননি। অনেকে হামাসের হামলার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত থাকায় তেমন গুরুত্ব দেননি। ভিডিও বিশ্লেষণ করে তখন সিএনএন জানায়, আয়োজকেরা যখন সঙ্গীত বাজানো বন্ধ করে দেন তখনই দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। কেউ কেউ গাড়িতে করে কাছের বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে যান। তবে পথে অনেককেই গুলি ও জিম্মি করে হামাসের সদস্যরা। 

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা পরিকল্পনা ও শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে হামাসকে ২৮ জন নিহত জিম্মির মরদেহও ফিরিয়ে দিতে হবে। যাদের মধ্যে দুজন মার্কিন নাগরিক। তবে চুক্তি আলোচনার সময় হামাস দাবি করেছিল, তারা সব মৃত জিম্মির দেহের সঠিক অবস্থান জানে না। কিছু ক্ষেত্রে, তারা বলেছে যেসব যোদ্ধারা ওই জিম্মিদের পাহারা দিচ্ছিল, তারা নিহত হয়েছে বা মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যেটি নিহত জিম্মিদের সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে তথ্য বিনিময় করবে এবং গাজার ভেতরে অনুসন্ধান পরিচালনা করবে।

ফিলিস্তিনি বন্দিরা কারা
ইসরায়েল যেসব ফিলিস্তিনিদের কারাগার থেকে মুক্তি দিচ্ছে তাদের মধ্যে ২৫০ জন আজীবন সাজাপ্রাপ্ত। যারা বেশ কয়েক বছর ধরে ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি ছিলেন। টাইমস ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময় প্রাণঘাতী হামলার অভিযোগে এসব বন্দিদের সাজা দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে আছেন হামাস, প্যালেস্টাইন ইসলামিক জিহাদ, ফাতাহ’র সদস্যরা। তবে হামাসের দাবিকৃত কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এই তালিকায় নেই।

সাজাপ্রাপ্তরা ছাড়াও মুক্তি দেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনিকে। দুই বছর আগে ৭ অক্টোবর তাদের গাজা থেকে আটক করেছিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। 

অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেসিল ফাররাজ আল জাজিরাকে বলেছেন, মুক্তিপ্রাপ্তরা কারাগারে থাকার সময় সম্ভবত ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমরা জানি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি কারাগারে নানাভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। তাদের নৃশংসভাবে পেটানো হয়েছে। যৌন সহিংসতার ঘটনাও শুনেছি।

কেন শান্তি সম্মেলন
গাজা নিয়ে শান্তি সম্মেলনটি হতে যাচ্ছে মিশরের শহর শারম আল শেখে। দেশটির প্রেসিডেন্টের দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে সিজিটিএন জানিয়েছে, সম্মেলন থেকে যুদ্ধ শেষ করা, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার নতুন অধ্যায় চালু সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা আছে।

শান্তি সম্মেলনে অংশ নিতে মিশরে গেছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস (মাঝে)। ছবি: এএফপি

বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি টিকিয়ে রাখতে মিশরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক স্টিফেন জিউনেস আল জাজিরাকে বলেন, এবার যুদ্ধবিরতিটি স্থায়ীভাবে কার্যকর করার জন্য দৃঢ় মনোভাব দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের সমর্থন না থাকলে এবার চুক্তি ভঙ্গ করা নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন হবে।

কিন্তু মিশরে হতে যাওয়া এই চুক্তিতে কি আছে? কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগটি জিম্মি ও বন্দি বিনিময় চুক্তি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির জন্য কোনো বিস্তৃত ও স্পষ্ট রূপরেখা নেই।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতিকে একটি বিস্তৃত শান্তি চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করলেও, বাস্তবে এটি দুই বছরের যুদ্ধের অবসান ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা কোনো দীর্ঘমেয়াদি শান্তির রূপরেখা দেখতে পাচ্ছি না। পশ্চিম তীরের দখল নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। গাজার ওপর ইসরায়েলি অবরোধ বা এই সংঘাতের কাঠামোগত কারণগুলো নিয়েও কিছু বলা হয়নি। -বলেন মোহাম্মদ এলমাসরি।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা পরিকল্পনায় গুরুতর সমস্যা আছে উল্লেখ করে এলমাসরি বলেন, বিশেষ করে ইসরায়েল কীভাবে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

আরও পড়ুন

×