বিশ্বে মশামুক্ত দেশের মর্যাদা হারাল আইসল্যান্ড, কারণ কী
আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
আইসল্যান্ডে পাওয়া কিউলিসেটা অ্যানুলাটা প্রজাতির মশা। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১৭:৫৩ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:০৯
ইউরোপের দেশ আইসল্যান্ডে প্রথমবারের মতো মশার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি পৃথিবীর একমাত্র মশামুক্ত দেশের মর্যাদা হারিয়েছে।
আইসল্যান্ডের জাতীয় বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বরাত দিয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসে প্রথমবারের মতো মশার উপস্থিতি শনাক্ত হয়। গত গ্রীষ্মে দেশটিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল। যা হিমবাহ গলে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এই রেকর্ড তাপমাত্রার পরই দেশটিতে মশার উপস্থিতি পাওয়া গেল।
দেশটিতে মশার উপস্থিতির কথা প্রথম জানা যায় ১৬ অক্টোবর। সেদিন বিয়র্ন হ্যালটাসন নামের এক ব্যক্তি (কীটপতঙ্গ অনুরাগী) ফেসবুকের একটি গ্রুপে পোকামাকড়ের ছবি পোস্ট করেন। জানান, কিয়োস হিমবাহ উপত্যকায় তিনি মশা দেখেছেন। রেড ওয়াইনের ফাঁদ (মিষ্টি স্বাদের ওয়াইন দিয়ে বানানো ফাঁদ) পেতে কিছু মশা ধরেছেনও।
কিয়োস উপত্যকা আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিক থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে। হ্যালটাসন ওই মশাগুলো দেশটির ন্যাচারাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটে পাঠান। সেখানে কীটতত্ত্ববিদ মাথিয়াস আলফ্রেডসন নিশ্চিত করেন যে, এগুলো সত্যিই মশা।
কোন ধরনের মশা পাওয়া গেছে?
আলফ্রেডসন বলেন, মশাগুলো কিউলিসেটা অ্যানুলাটা প্রজাতির। মশার এই প্রজাতিটি শীত-সহনশীল। এগুলো বেশি পাওয়া যায় ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও হিমালয়ের উত্তরের এলাকায়। এই প্রজাতির মশা রোগ বহন করে না। তবে এগুলো বেশ বিরক্তিকর।
গত মঙ্গলবার ন্যাচারাল সায়েন্স ইনস্টিটিউট প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই প্রজাতির মশা ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। শীতকালে পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। এটি কামড়ায়, তবে সংক্রমণ ছড়ায় না।
কেন আইসল্যান্ডে আগে মশা ছিল না?
বিশ্বে মশার প্রজাতি আছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি। আইসল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার মতো ব্যতিক্রম ছাড়া এগুলো পৃথিবীর প্রায় সব জায়গায় কম বেশি দেখা যায়।
মশারা জন্মায় অগভীর, স্থির পানিতে। যেমন জলাভূমি বা ছোট পুকুর। আইসল্যান্ডে এমন পরিবেশ থাকলেও মশা ছিল না। এর মূল কারণ হলো, মশা শীতল রক্তের পতঙ্গ। উষ্ণ পরিবেশে ভালোভাবে বেঁচে থাকে।
যুক্তরাজ্যের পরিবেশ বিজ্ঞানী লুক টিলি বলছেন, উষ্ণ বায়ু ও পানি মশার বৃদ্ধি, খাদ্যগ্রহণ ও প্রজননকে ত্বরান্বিত করে। এগুলোর দেহে থাকা জীবাণুরও দ্রুত বিকাশ ঘটায়। উষ্ণ মৌসুম যত দীর্ঘ হয়, মশার প্রজন্মও ততো বাড়ে। বৃষ্টিপাতের পর জলাবদ্ধ স্থানও মশার বংশবিস্তার বাড়ায়।
আইসল্যান্ডের আবহাওয়া সাধারণত বছরজুড়ে শীতল থাকে। শীতকালে গড় তাপমাত্রা থাকে মাইনাস ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, গ্রীষ্মে ১১ ডিগ্রি। মশা শীতল মৌসুমে ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম থেকে লার্ভা হয়। কিন্তু আইসল্যান্ডের পানি বছরে বারবার জমে ও গলে। ফলে পরিবেশটি মশার টিকে থাকা বা প্রজননের জন্য উপযুক্ত নয়।
নিকট অতীতে এর আগে আইসল্যান্ডে মশার উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল ১৯৮০ সালে। তবে সেটি স্থানীয়ভাবে জন্ম নেওয়া ছিল না। জীববিজ্ঞানী গিসলি মার গিসলাসন গ্রিনল্যান্ড থেকে উড়োজাহাজে করে আইসল্যান্ডে যাওয়ার সময় ভেতরে একটি মশা দেখতে পান। ঘটনাটি এতটাই বিরল ছিল যে, দেশটির ইনস্টিটিউট অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি’তে ওই মশা সংরক্ষণ করা হয়।
এখন কেন মশা পাওয়া যাচ্ছে
ন্যাচারাল সায়েন্স ইনস্টিটিউটের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বিশেষ মশাগুলো আইসল্যান্ডে কীভাবে এসেছে তা স্পষ্ট নয়। ধারণা করা হচ্ছে, পণ্য পরিবহনের সময় এসেছে। আবার স্থানীয়ভাবে বংশ বিস্তার করছে কি না সেটিও অনিশ্চিত। তবে যেসব ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তা অনুযায়ী বলা যায়, মশাগুলো আইসল্যান্ডের পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম।
ইনস্টিটিউট আরও জানিয়েছে, উষ্ণায়ন ও যোগাযোগের পরিবহন বৃদ্ধির কারণে নতুন ধরনের পোকামাকড়ের সংখ্যা বাড়ছে। এখানে দ্রুত গতিতে উষ্ণতা বাড়ছে।
চলতি বছরের মে মাসে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। মে মাসে আইসল্যান্ডের গড় তাপমাত্রা ১৯৯০-২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। যা বিশ্বের গড় উষ্ণায়ন ১.৩ ডিগ্রির চেয়ে ১০ গুণ বেশি। আইসল্যান্ডের জাতীয় পার্ক কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, হিমবাহ দ্রুত গলছে। এমন চলতে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় অর্ধেক আয়তন কমে যাবে।
- বিষয় :
- মশা
- জলবায়ুর পরিবর্তন
- আল জাজিরার প্রতিবেদন
