শিশুদের খেলনা যেভাবে ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করল
‘লার্নিং রিসোর্সেস’ -এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিক ওল্ডেনবার্গ। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে
রয়টার্স
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৬:৪৬ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৬:৫২
শিশুদের খেলনা সামগ্রী, তাও আবার চীনে তৈরি- এই পণ্যই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি আদেশকে অবৈধ ঘোষণার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের পদক্ষেপকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা বা বাতিলের রায় দিয়েছেন গত শুক্রবার। এই রায়ের পেছনে আছে ‘লার্নিং রিসোর্সেস’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ইলিনয়ভিত্তিক ‘লার্নিং রিসোর্সেস’ বেশিরভাগ শিক্ষামূলক খেলনা চীন থেকে আমদানি করে। গত এপ্রিলে ট্রাম্পের শুল্কের বিরুদ্ধে মামলা করা প্রথম ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর মধ্যে এটি একটি।
অন্য আমদানিকারকদের সঙ্গে এই কোম্পানিটি এখন কয়েক কোটি ডলার শুল্ক ফেরত চাইতে পারে। যদিও এই অর্থ কীভাবে বা কবে ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় তিন দশক আগে রিক ওল্ডেনবার্গ নামের এক ব্যক্তি তাঁর পারিবারিক খেলনা ব্যবসার হাল ধরেন। তখন রাজনীতি বা মামলা-মোকদ্দমার বিষয় তাঁর ভাবনাতেও ছিল না। অথচ তিনিই গত কয়েক বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি রায়ের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হলেন।
আমদানিকারক, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য সরকার এবং অন্যদের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ট্রাম্পের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’-এর অধীনে শুল্ক আরোপের পদক্ষেপকে বাতিল করে দেন।
২০২৫ সালের ইউএস চেম্বার অব কমার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, লার্নিং রিসোর্সেস এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘হ্যান্ডটুমাইন্ড’-এর মতো ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো প্রায় ৯৭ শতাংশ (বার্ষিক ৮৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার) পণ্য আমদানি করে। প্রতিবেদনে ট্রাম্পের শুল্ককে এসব ব্যবসার টিকে থাকার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প শুল্কের ঘোষণা দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে ওল্ডেনবার্গ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। জুনে ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা জেতার পর লার্নিং রিসোর্সেস সুপ্রিম কোর্টকে বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনার অনুরোধ জানায়।
ওল্ডেনবার্গ রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, চুপ করে থাকার চেয়ে কথা বলাটা আমার জন্য সহজ।’ তিনি জানান, এই আইনি লড়াইকে রাজনৈতিকভাবে দেখেননি। এটি কর সংক্রান্ত বিষয়। তিনি আরও বলেন, ‘সব আমেরিকানই একমত, আমরা অনেক বেশি কর দেই। কেউ এমন কর দিতে চাইবে না, যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’
কী ধরনের খেলনা ব্যবসা
রয়টার্স জানায়, ওল্ডেনবার্গের বংশের সঙ্গে মিশে আছে খেলনা। ১৯৮৪ সালে তাঁর মা ‘লার্নিং রিসোর্সেস’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর ভিত্তি ছিল এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে তাঁর দাদার শুরু করা একটি ব্যবসা। ‘হ্যান্ডটুমাইন্ড’-এর সঙ্গে মিলে তারা শিক্ষামূলক পণ্য তৈরি করে। এর মধ্যে আছে ‘অ্যালফাবেট কফি কাপ’ (বড় ও ছোট হাতের বর্ণ চিনতে সাহায্য করে) এবং ‘নম্বর ব্লকস’ (গণিত শেখার খেলনা সেট)।
৫০০ জন কর্মী নিয়ে এই কোম্পানিটি প্রায় ১০০টি দেশে পণ্য বেচে। তাদের উৎপাদনের বেশিরভাগ অংশই হয় চীনে- যে দেশকে সবচেয়ে কঠোর শুল্কের মুখে পড়তে হয়েছিল। ওল্ডেনবার্গের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তিনি প্রায় ১ কোটি ডলার শুল্ক দিয়েছেন।
শুল্কের কারণে তাঁকে কোম্পানির সম্প্রসারণ পরিকল্পনা কাটছাঁট করতে হয়েছে।
যেমন- ইলিনয়ে ৬ লাখ বর্গফুটের গুদাম ও অফিস করার পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে। কর্মীদের নিয়োগ করতে হয়েছে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) পুনর্গঠনের কাজে। রাতারাতি বদলে গেছে বিক্রয়, বিপণন এবং পণ্য উন্নয়নের পরিকল্পনা। উদ্ভাবনের বদলে কোম্পানিটি টিকে থাকার লড়াইয়ে মন দিতে বাধ্য হয়। খরচের সঙ্গে আয়ও কমে যায়। ওল্ডেনবার্গ বলেন, ‘গত বছর আমাদের ব্যবসা সংকুচিত হয়েছে।’
ওল্ডেনবার্গের শুল্কবিরোধী প্রচারণার একটি মূল লক্ষ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া প্রস্তাবের (উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা) ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা। তিনি বলেন, ‘মাথার ওপর বোমা পড়েছে। এমন জরুরি অবস্থায় কোনো দেশ থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা সরিয়ে আনা অসম্ভব।’
খেলনা তৈরির জন্য ওল্ডেনবার্গের ব্যবসায় ৩০টিরও বেশি ইনজেকশন মেশিন ব্যবহার করা হয়, যেগুলোর প্রতিটির ওজন কয়েক টন। এগুলো সরিয়ে নেওয়া ব্যয়বহুল এবং লজিস্টিক্যালি প্রায় অসম্ভব।
পাশাপাশি অভিজ্ঞতার বিষয়ও আছে। চীনে ওল্ডেনবার্গের সহযোগী কারখানাগুলো বছরের পর বছর ধরে খেলনা তৈরি করছে। তাদের আছে বিশেষ দক্ষ জনবল এবং খেলনা শিল্পের কঠোর নিরাপত্তা মান বজায় রাখার সক্ষমতা। এর বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করতে মাস বা বছর লেগে যেতে পারে মত ওল্ডেনবার্গের।
এখন আদালতের রায়ের পর ওল্ডেনবার্গ আশা করছেন, কোম্পানিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারবেন। সরকার শুল্কের অর্থ ফেরত দেবে। তিনি বলেন, ‘টাকা পাওয়া মাত্র আমরা তা খরচ শুরু করব। আবারও আমাদের কোম্পানি স্বাভাবিকভাবে চালাতে চাই।’
(ভাষান্তর: হানযালা হান)
- বিষয় :
- পাল্টা শুল্ক
- মামলা
- খেলনা
- আদালতের রায়
- যুক্তরাষ্ট্র
