ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন ঝুঁকি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ | ১১:২৬
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা, এর জেরে মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ দেশে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলা ও চলমান সংঘাতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়বে। ইরানের সীমায় হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে জাহাজ পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি। এতে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হবে। পুরোনো রপ্তানি আদেশের পণ্য সময়মতো হাতে পাবে না ব্র্যান্ড-ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ কারণে নতুন করে রপ্তানি আদেশও দিতে চাইবে না তারা। নতুন রপ্তানি আদেশ ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না বলে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সরাসরি সতর্কতা জরি করেছে গত শনিবার। এরপর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে। প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালি ব্যবহার করে পরিবহন করা হয়। এখন বিকল্প পথে জাহাজগুলোকে এখন অনেক বেশি সময় ও খরচ দিয়ে বিকল্প পথে পৌঁছতে হবে। শিপিং রুট পরিবর্তন করে বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপ ও আমেরিকায় যেতে হবে। এতে যাতায়াতের সময় প্রায় ১০-১৫ দিন বেড়ে যেতে পারে। নৌপথ অনিরাপদ হওয়ায় বীমা প্রিমিয়াম এবং জাহাজ ভাড়া ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা রপ্তানিকারকদের মুনাফায় টান দেবে।
বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ থেকে ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অভ্যন্তরে। জ্বালানি সংকটে কারখানায় লোডশেডিং এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও জেনারেটরের খরচ বেড়ে যাবে, ফলে পোশাক খাতের সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় ৫ থেকে ৮ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে এবং উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন করে দেখা দেওয়া এই সংকটের কারণে জাহাজ ভাড়া ও বীমা খরচ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ইউরোপের ২৭ দেশে এবং যুক্তরাষ্ট্রে লিড টাইম বা ক্রেতার হাতে পণ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে ৫ থেকে ১০ শতাংশ। এ সব কারণে নতুন রপ্তানি আদেশ ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়লে পশ্চিমা দেশগুলোর ভোক্তারা তাদের বিলাসদ্রব্য ও পোশাক কেনা কমিয়ে দেবে। এতে প্রধান দুই বাজারে রপ্তানি কমে যেতে পারে আশঙ্কাজনক হারে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্টের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সমকালকে বলেন, হরমুজ প্রণালি একটি সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যা পারস্য উপসাগরকে বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করে। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সংকট-বিন্দু হিসেবে ধরা হয়। কারণ বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি এই পথ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে রপ্তানি হয়, যাদের কাছে বৈশ্বিক তেলের প্রায় অর্ধেক এবং গ্যাসের
প্রায় ৪০ শতাংশ মজুত রয়েছে। এই তেল ও গ্যাসের প্রায় ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশ বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে রপ্তানি হয়। বাংলাদেশ সরাসরি এই প্রণালির আশপাশে অবস্থিত না হলেও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে। কারণ হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের উত্তেজনা, অবরোধ বা যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি খরচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ের চাপ বাড়ে এবং চূড়ান্তভাবে পোশাকের উৎপাদন ব্যয় ব্যাপক বেড়ে যায়।
- বিষয় :
- রপ্তানি বাণিজ্য
