ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাহসী নারী

জেফরি এপস্টেইনকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়েছিলেন যিনি

জেফরি এপস্টেইনকে আকাশ থেকে মাটিতে নামিয়েছিলেন যিনি
×

জুলি কে ব্রাউন। ফাইল ছবি

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ১২:৫৭

আপাতদৃষ্টিতে ঘটনার শুরু খুবই সাধারণ একটি নিয়োগ থেকে। ২০১৭ সালের ২৮ এপ্রিল আলেকজান্ডার আকস্তা নামে সাবেক এক বিচারককে শ্রম সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য সবার কাছে এই নিয়োগ সাধারণ মনে হলেও একজন সাংবাদিকের চোখে তা সন্দেহজনক মনে হয়। তাঁর নাম- জুলি কে ব্রাউন।

আলেকজান্ডারের ওই নিয়োগের পর প্রায় স্থবির হয়ে যাওয়া একটি মামলার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন ফ্লোরিডার মায়ামি হেরাল্ডের সাংবাদিক জুলি। সেটি ছিল মার্কিন বিনিয়োগকারী জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত। জুলি দেখেন, ২০০৮ সালে প্রথম দফায় গ্রেপ্তারের পরও কোনো বিচার ছাড়াই ছাড়া পেয়েছিলেন এপস্টেইন। এর পেছনে হোতা ছিলেন তৎকালীন বিচারক আলেকজান্ডার আকস্তা।

আকস্তার নিয়োগের সূত্র ধরে একের পর এক মামলার বাদীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া শুরু করেন জুলি। এরপরের ঘটনাগুলোর বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়েছেন দ্য নিউইয়র্কার সাময়িকীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। প্রায় ৮ মিনিটের ওই ভিডিও সাক্ষাৎকারে জুলি তুলে ধরেন ১৪ বছরের ঘটনাক্রম। যেটি শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচের একটি থানা থেকে। পুলিশের কাছে তখন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ জানাতে গিয়েছিল কয়েক কিশোরী।

জুলি বলেন, পুলিশ অভিযোগটিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছিল। মেয়েগুলো বলেছিল কীভাবে এপস্টেইনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছিল। তারা একে অপরকে না চিনলেও সবার বর্ণনাই ছিল একই রকম। তাদের নিয়োগ দেওয়া হতো ম্যাসাজ করার জন্য। বলা হতো এজন্য তাদের কাপড়ও খুলতে হতে পারে। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ পাবে। তদন্তের শেষ দিকে পুলিশ প্রায় ২৪ জনের খোঁজ পায়। এপস্টেইনের ডাস্টবিনে থাকা চিরকুট ও ফোন রেকর্ড ঘেঁটেও দেখা যায়, মেয়েগুলোর সঙ্গে পাচারকারীদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

২০১৭ সালে জুলি যখন এই মামলার সঙ্গে যুক্ত হন ততদিনে সেটি স্থবির হয়ে গেছে। সমস্ত নথিপত্র সিলগালা করা ছিল। এপস্টেইনও মুক্তভাবে চলাফেরা করছিল। সাক্ষাৎকারে জুলির কাছে জানতে চাওয়া হয়- ওই সময় কীভাবে জট খুলেছিলেন? জুলি বলেন, এপস্টেইন দোষ স্বীকার করার পর কয়েকজন ভুক্তভোগী ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে।

তাদের দাবি ছিল, যেভাবে আপস করে এপস্টেইনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তা ভুক্তভোগী অধিকার আইন লঙ্ঘন করেছে। আইন অনুযায়ী, অপরাধীর সাজা ঘোষণার সময় ভুক্তভোগীদের উপস্থিতি এবং মামলার বর্তমান অবস্থা জানার পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু ওই মামলায় সেটির কিছুই করা হয়নি। ২০০৮ সালে তারা মামলা করলেও ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিচারক কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।

জুলি বলেন, আমার মনে হলো এই মেয়েগুলো এখন বয়সে পরিণত নারী। তাদের কেন ১০ বছর ধরে বিচারের জন্য লড়তে হচ্ছে? ঠিক একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন আলেকজান্ডার আকস্তাকে শ্রম সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। আমার কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলো। কারণ, এই সেই ব্যক্তি যিনি এক সময় এপস্টেইনকে প্রায় বিনা সাজায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন তিনি এমন একটি সংস্থার দায়িত্বে যাচ্ছেন যার কাজ হলো মানবপাচার এবং শিশু শ্রম আইন তদারকি করা।

শুরুতে জুলির উদ্দেশ্য ছিল কেবল ভুক্তভোগী নারীদের খুঁজে বের করে একটি ফলো-আপ প্রতিবেদন করা। তখনও তিনি জানতেন না ঘটনাটি বড় এক অনুসন্ধানের দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে। জুলি বলেন, ভুক্তভোগীদের খুঁজে বের করা ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ, নথিতে সবার ছদ্মনাম ‘জন ডো’ হিসেবে উল্লেখ ছিল। অনেক ঘাঁটাঘাঁটির পর কিছু জায়গায় অসম্পূর্ণ নাম ও জন্ম তারিখ খুঁজে পান। এভাবে প্রায় ৬০ জনকে শনাক্ত করেন। তখনই গল্পের মোড় ঘুরে যায়। 

এপস্টেইন কেলেঙ্কারির ভুক্তভোগীদের অনেকে তখন মাদকাসক্ত ছিলেন। কেউ কেউ মারা গেছেন। অথচ অভিযুক্ত এপস্টেইন তাঁর ব্যক্তিগত জেটে চড়ে ইউরোপ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। জুলি বলেন, আমার মনে হলো, আগের কোনো লেখাতেই এই নারীদের ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে এবং কেন এমনটা হয়েছে তা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। তাই তিনি সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য জীবিত সবার ঠিকানায় চিঠি পাঠান। মাত্র চারজন ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হয়।

জুলি বলেন, এতদিন শুধু এপস্টেইনকে ঘিরে মুখরোচক যৌনতার খবর প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি বিচার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার চিত্র তুলে ধরতে বেশি গুরুত্ব দেন। কারণ, ভুক্তভোগীরা শুধু শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতই হননি, বরং তারা নাগরিকের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারের দ্বারাও প্রতারিত হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের নভেম্বরে মায়ামি হেরাল্ডে ‘পারভারশন অব জাস্টিস’ শিরোনামে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এরপরই শূন্যে ওড়া এপস্টেইনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জুলি বলেন, প্রতিবেদনে মানুষের সাড়া দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এপস্টেইন গ্রেপ্তার হওয়ার পর অন্যান্য গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা সরকারি কৌঁসুলি জিওফ্রে বারম্যানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘এখনই কেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো?’ বারম্যান তখন আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা অসাধারণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাহায্য পেয়েছি। জুলি, আপনাকে ধন্যবাদ।’

যৌন নিপীড়ন ও নারী পাচারের মামলায় গ্রেপ্তারের পর ২০১৯ সালে কারাগারে আত্মহত্যা করেন এপস্টেইন। এরও প্রায় ৬ বছর পর মার্কিন বিচার বিভাগ কয়েক লাখ নথি প্রকাশ করেছে। যেগুলোতে ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, বিল গেটস, সাবেক ব্রিটিশ যুবরাজ অ্যান্ড্রু আলবার্ট, যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাবেক নেতা পিটার ম্যান্ডেলসনের নাম আছে। বিশ্বের প্রভাবশালী এসব ব্যক্তিদের অন্ধকার জগতের গল্প তুলে আনতে যিনি মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই জুলি কে ব্রাউনকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

আরও পড়ুন

×