বিশ্লেষণ
ইরান যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ‘হারানো’ ট্রাম্প মোড় বদলের উপলক্ষ্য পেলেন
ইরানে বিধ্বস্ত বিমানের ক্রু উদ্ধারের ঘটনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধের মোড় বদলের আশা করতে পারেন। ছবি: সংগৃহীত
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:৩৪ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:১৬
যুদ্ধ যদি শুক্রবারই শেষ হয়ে যেত তাহলে, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে জয়ী দাবি করার সময় হাতের কাছে কি কি পেতেন? তালিকাটা খুব বেশি দীর্ঘ নয়। উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে আছে- আলি খামেনিকে হত্যা এবং ইরানের সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস।
কিন্ত পরাজয়ের হিসাব করতে গেলে (শনিবার পর্যন্ত) ট্রাম্পের হারানোর তালিকাকে দীর্ঘ করতো যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত ও ক্রু নিখোঁজের ঘটনা। বিশেষ করে নিখোঁজ ক্রুদের সন্ধান পেয়ে ইরান যদি তাদের ছবি প্রকাশ করতো, তাহলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সে ঘটনা হতো কলঙ্কজনক অধ্যায়। অনেকটা ১৯৮০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মতো।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালি খুলতে মিত্রদের কাছে থেকে সাড়া না পাওয়ার প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প যখন ঘনঘন নীতি বদলাতে বাধ্য হচ্ছিলেন, তখনই ক্রু উদ্ধারের ‘সফল’ অভিযান তাঁকে যেন স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলার সুযোগ দিয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টেও সেটি ফুটে উঠেছে। উদ্ধারের খবর জানাতে গিয়ে রোববার তিনি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে লিখেছেন, ‘উই গট হিম!’ বা ‘আমরা তাঁকে পেয়েছি!’ ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের আগে এমন ‘সফলতা’ ট্রাম্পকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।
ইতিহাস বদলের স্বস্তি?
ইরান যুদ্ধের শেষ পরিণতি যাই হোক- ক্রু উদ্ধারের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪৫ বছর আগের একটি ব্যর্থতার গ্লানি ঘোচাতে পেরেছে। ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাসে তেহরানে জিম্মি ৫৩ জন আমেরিকানকে উদ্ধারে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘ঈগল ক্ল’ নামের একটি অভিযান। ওই সময় ৩৪ বছর বয়সী রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প তৎকালীন প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
মার্কিন সাংবাদিক রোনা ব্যারেটকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তারা (ইরান) আমাদের লোকদের জিম্মি করে রেখেছে। এটি একেবারেই হাস্যকর। এই দেশ (যুক্তরাষ্ট্র) চুপচাপ বসে আছে এবং ইরানের মতো একটি দেশকে মার্কিন নাগরিকদের আটকে রাখার সুযোগ দিচ্ছে। আমার মতে এটি একটি ভয়াবহ ব্যাপার।’ জিম্মি সংকটের পর ইরানে সেনা না পাঠানো নিয়েও আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের ওই সাক্ষাৎকারের প্রায় এক বছর আগে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হয়। ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে সশস্ত্র ইরানিরা তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৫৩ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে। পরে সিআইএ ও পেন্টাগন ‘ঈগল ক্ল’ নামে একটি গোপন উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা শুরু করে।
মার্কিন যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালের ২৪ এপ্রিল জিম্মিদের উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছিল। কিন্তু ইরানের বৈরি আবহাওয়া এবং হেলিকপ্টারের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাঝপথে গিয়ে উদ্ধারকারীরা অভিযান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ফেরার সময় দুটি হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে আট সেনা নিহত হন। পরে ইরান সরকার ওই হেলিকপ্টারগুলোর ধ্বংসাবশেষ টেলিভিশনে প্রচার করে।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তাঁর মেয়াদের বাকি মাসগুলোতে জিম্মিদের মুক্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যান। কিন্তু কাজ হয়নি। দীর্ঘ ৪৪৪ দিন আটকে রাখার পর ইরান সরকার ১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে জিম্মিদের মুক্তি দেয়।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যেই গত ৯ মার্চ ৪৫ বছর আগের সেই ঘটনাকে ‘মার্কিন জিম্মি ও অন্যায়ভাবে আটক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন ট্রাম্প। শনিবারের ক্রু উদ্ধার ঘটনার মাধ্যমে কি ব্যর্থতার ইতিহাস ঢাকার সুযোগ তৈরি হলো?
ক্রু উদ্ধার কি যুদ্ধের মোড়
গত ৪৮ ঘণ্টায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। মিত্রদের সাড়া না পাওয়া, অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাসোলিনের দাম বৃদ্ধির ঘটনা প্রশাসনের মধ্যে হতাশা ও জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছিল। সম্ভাব্য স্থল অভিযানের আগে ইরানে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনাকে অশনি সংকেত হিসেবে দেখছিলেন কেউ কেউ।
বিবিসির সাংবাদিক জো ইনউড রোববার লিখেছেন, ইরানিরা যখন মার্কিন ক্রুর সন্ধান করছিল, তখনই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল- খোঁজ পেলে ওই ক্রুর ছবি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচার করা হবে। সামাজিক মাধ্যমেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো ক্রু বন্দির ছবি ছড়াচ্ছিল।
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের কয়েকদিন আগেও ট্রাম্প প্রশাসন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিল, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুক্রবার যখন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়, তখন ওয়াশিংটনের সেই আস্ফালন কিছুটা হাস্যকরে পরিণত হয়।
জো ইনউড লিখেছেন, অনেকেই মনে করছিলেন যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে ট্রাম্পের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃসাহসিক ও বিপজ্জনক উদ্ধার অভিযান সফল করার মাধ্যমে ট্রাম্প এখন যুদ্ধের মোড় নিজের দিকে ঘোরানোর আশা করছেন।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রুদের উদ্ধারের পর ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে ট্রাম্প তাঁর আগে হুমকিকে আরও জোরালো করেছেন। লিখেছেন, ‘একটি চুক্তিতে পৌঁছানো অথবা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে দশদিন সময় দিয়েছিলাম। সেই সময় ফুরিয়ে আসছে। আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা বাকি। এরপরই তাদের ওপর নরক (রূপক অর্থে বড় হামলা) নেমে আসবে।’
তবে ইরানও নিজেদের সফলতার দাবি করছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ‘ক্রু উদ্ধার অভিযানে যাওয়া তিনটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানও ব্যর্থ হয়েছে।’ একমাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে উভয়পক্ষের প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টার উদাহরণ কম নয়। ক্রু উদ্ধার অভিযান নিয়ে ওয়াশিংটন এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। উদ্ধার অভিযানের সুনির্দিষ্ট স্থানটি কোথায় ছিল তাও স্পষ্ট নয়।
