পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী সহিংতায় নিহত ২, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ফাইল ছবি
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ২১:৪২
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাজ্যজুড়ে একদিকে স্লোগান ও উৎসবের আমেজ, অন্যদিকে শুরু হয়েছে ভোট-পরবর্তী সহিংসতা, দলীয় কার্যালয় দখল ও প্রাণহানির ঘটনা। রাজ্যের একাধিক জায়গায় সংঘর্ষে অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির নিরাপত্তা প্রত্যাহার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজ্য সরকারের সচিবালয় ‘নবান্ন’ মুখরিত হয়ে ওঠে ‘জয় শ্রী রাম’ ও ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগানে। খোদ সরকারি কর্মীরাই এই স্লোগান দেন এবং একে অপরকে আবির মেখে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়ির গলির মুখে থাকা সিজার ও রিমোট কন্ট্রোল ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক ব্যানার্জির দপ্তরের সামন থেকেও পুলিশি প্রহরা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ওপর থেকে পুলিশি বিধিনিষেধ রদ করা হয়েছে।
উদয়নারায়ণপুর বিধানসভা কেন্দ্রের দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় যাদব বর (৪৮) নামে এক বিজেপি সমর্থককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, যাদব বর বিজেপির সমর্থক ছিলেন। সোমবার রাত প্রায় ১১টার দিকে যাদব বর বাড়ি ফেরার পথে একদল লোক তাকে ঘিরে ধরে এবং নির্মমভাবে মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত উদয়নারায়ণপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাটির খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। অভিযুক্তদের খোঁজে অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
অন্যদিকে, নানুরের সন্তোষপুর গ্রামে আবির শেখ (৪৫) নামে এক তৃণমূল কর্মীকে রাস্তায় একা পেয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চাঁদু শেখ নামে আরও একজন আহত হয়েছেন।
রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী এবং শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবের নিজের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধে। তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর চালিয়ে তৃণমূলের পতাকা নামিয়ে বিজেপির পতাকা লাগিয়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে তৃণমূল কর্মী মানস ভৌমিক বলেন, “বিজেপি-আশ্রিত দুর্বৃত্তরা আমাদের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। যাদের এখনও সরকার গঠন হয়নি, তাদের এই পরিস্থিতি।”
অন্যদিকে পাল্টা অভিযোগ অস্বীকার করে বিজেপি কর্মী সুজয় বিশ্বাস জানান, “এগুলো বিজেপির কাজ নয়। আমাদের দলীয় নেতৃত্ব এগুলো নির্দেশ দেয় না। যারা রাতারাতি মুখে আবির মেখে বিজেপি হতে চাইছে, এটা তাদের কাজ। এই কাজকে আমরা কখনোই প্রশ্রয় দিই না।”
একাধিক কলেজে তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপির বিরুদ্ধে। গোবরডাঙ্গা কলেজ, মহিষাদল রাজ কলেজ, জঙ্গলমহলের বাঁকুড়া থেকে উত্তরবঙ্গের একাধিক কলেজে ছাত্র সংসদ দখল নেওয়ার ছবি উঠে এসেছে।
ভোটপর্ব মিটে যাওয়ার পরেই হাওড়া জেলার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শ্যামল মিত্রকে বেধড়ক মারধরের ছবিও সামনে এসেছে।
এদিকে রাজ্যজুড়ে বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে যে হামলা, অশান্তি পাকানোর অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য রেখেছেন মমতা ব্যানার্জি, সিপিআইএম নেতা মোহাম্মদ সেলিম ও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
মমতার দাবি, “আমরা যখন জিতেছিলাম, আমি বলেছিলাম কারও ওপর যেন অত্যাচার না হয়। বদল চাই, বদলা নয়। আমরা সিপিএমের একটি পার্টি অফিসেও হাত দিইনি, অত্যাচার করিনি। আমি রবীন্দ্রসংগীত আর নজরুলগীতি গাইতে দিয়েছিলাম। আর তিন দিন ধরে বিজেপি অত্যাচার করছে। সিআরপিএফ—এটা জওয়ান বাহিনী নয়, বুট বাহিনী।”
মমতার দাবিকে মিথ্যা উল্লেখ করে সেলিম বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মিথ্যা কথা বলছেন। আজ তিনি আক্রান্ত হয়েছেন, তাই তিনি সরব হয়েছেন। ২০১১ সালের ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাস ভারতবর্ষের ইতিহাসে নজির। ভোট শেষ হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের ৩ হাজার পার্টি অফিস ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, অগ্নিসংযোগ করা হয়, দখল নেওয়া হয়। এর পরবর্তী দুই মাসে আমাদের ৩০০-এর বেশি কর্মীকে খুন করা হয়।
এরপর লোকসভা, বিধানসভা—সব নির্বাচনে তাদের ভয়াবহ রাজনৈতিক হামলার শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সেলিম।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়ে শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, “কেউ বিজেপির পতাকা হাতে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির সামনে অসভ্যতা করে বা কদর্য ভাষা ব্যবহার করে, অথবা দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর, কোনো টোটো-অটো ইউনিয়ন থেকে অর্থ আদায় করে বা এ ধরনের কাজে যুক্ত থাকে, তাহলে তাদের রেয়াত করা হবে না। তাদের দল থেকে বের করার অধিকার দল আমাকে দিয়েছে। আমরা পুলিশ প্রশাসনকে দলমত নির্বিশেষে, রং না দেখে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছি।”
শমীক ভট্টাচার্য অভিযোগ করেন, বিজেপিকে বদনাম করার জন্য বহু জায়গায় তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা বিজেপির ঝান্ডা ধরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করছেন।
এদিকে বহরমপুরের বিজেপি নেতা কাঞ্চন মৈত্র এবং নবদ্বীপের বিধায়ক শ্রুতি শেখর পাত্র দখল হয়ে যাওয়া পার্টি অফিসগুলো থেকে নিজেদের ঝান্ডা খুলে পুনরায় তা তৃণমূল কর্মীদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া, বারাসাতের বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর চট্টোপাধ্যায় নিজে থানায় গিয়ে দলমত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে অনুরোধ জানিয়েছেন।
- বিষয় :
- পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন
- সহিংসতা
- নিহত দুই
