বিধানসভায় বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়
ফল প্রকাশের পর রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা, হতাহত
পদত্যাগ করবেন না মমতা সাংবিধানিক সংকটের শঙ্কা
নির্বাচনে হারের পর মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
শুভজিৎ পুততুণ্ড, কলকাতা
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৯:০৮ | আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ | ০৯:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গেলেও পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গতকাল মঙ্গলবার কালীঘাটের বাড়িতে সংবাদ সম্মেলনে মমতা বলেন, ‘এখনই ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা হারিনি; জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?’
রাজ্যের বিদায়ী সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামীকাল ৭ মে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করলে কী হবে– এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। তিনি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ না করলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নতুন নজির সৃষ্টি হবে। ভোটে হারের পরও ইস্তফা না দেওয়ার নজির ভারতে নেই। সংবিধানেও এমন পরিস্থিতির বিষয়ে আলাদা করে উল্লেখ নেই। কারণ, কোনো মুখ্যমন্ত্রী ভোটে হারের পর রাজ্যপালের কাছে ইস্তফা দেবেন না– এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হবে বলে কেউ মনে করেননি।
ভোটে হারলে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দেওয়াটা ‘নিয়ম’ নয়, এটি সাধারণ রেওয়াজ বা সাংবিধানিক শিষ্টাচার। ইস্তফা না দিলে আনুষ্ঠানিকভাবে আগামীকাল ৭ মে পর্যন্ত মমতাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ওই দিন। ৭ মে (আগামীকাল বৃহস্পতিবার) পেরোলেই তাঁর মুখ্যমন্ত্রীর পদ থাকবে না। ইস্তফা না দিলেও নামের আগে জুড়ে যাবে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী।
১৫ বছর আগে ২০১১ সালের ১৩ মে দুপুর ১টা নাগাদ ভোটের ফল স্পষ্ট হওয়ার পরই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজভবনে গিয়ে তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর কাছে ইস্তফাপত্র তুলে দেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি রাজভবন থেকে সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন দলের গাড়িতে করে।
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শেখর নাফাদে বলেন, মমতা রাজ্যপালের কাছে যেতে অস্বীকৃতি জানালেও তাতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। রাজ্যপাল বিধানসভা ও সরকার ভেঙে দিতে পারেন, যেহেতু জনগণের ম্যান্ডেট শেষ হয়ে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাই বিধি মেনেই সরকারকে বিদায় নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করলেও নতুন বিধানসভা গঠন ও নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়াই রাজ্যপাল নতুন বিধানসভায় নতুন সরকারের জন্য নতুন মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন। মেয়াদের মাঝপথে মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তনে সাংবিধানিক বাধা থাকলেও বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নতুন বিধানসভা গঠনে কোনো বাধা নেই।’
এ পরিস্থিতিতে সব নজর এখন রাজ্যপালের ওপর। রাজ্যপাল এখানে সাংবিধানিক রেফারি হিসেবে কাজ করেন। তিনি এটি নিশ্চিত করেন যেন সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনপুষ্ট একটি সরকার ক্ষমতায় থাকে। সাধারণত এ পরিস্থিতিতে রাজ্যপালের তরফে তিনটি পদক্ষেপ অনুসরণ করা হয়। প্রথমত, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি কোনো অনিশ্চয়তা থাকে, তবে বিধানসভায় ফ্লোর টেস্ট বা শক্তি পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। তৃতীয়ত, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে নতুন সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মমতার পদত্যাগ না করার ঘোষণা মূলত একটি রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে, অথবা তিনি বরখাস্ত হবেন।
আজ বুধবার রাতে কলকাতায় আসার কথা ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা ও দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর। রাতেই তিনি বিজেপির পরিষদীয় দলের সঙ্গে বৈঠক করে নেতার নাম ঘোষণা করতে পারেন। যিনি পরিষদীয় দলের নেতা হবেন, তিনিই হবেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। তিনিই রাজ্যপালের কাছে গিয়ে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আর্জি জানাবেন। তারপর হবে শপথগ্রহণ।
সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন মমতা
গতকাল কালীঘাটের বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে মমতা বলেন, ‘আমি রাজভবন কেন যাব? আমরা তো হারিনি। জোর করে দখল করে কেউ যদি ভাবে আমাকে গিয়ে পদত্যাগ করতে হবে, সেটি হবে না। আমরাই জিতেছি, আমরা হারিনি। আমি চেয়ারের কেয়ার করি না। আমি যাব না আর। আমি সব তথ্য প্রমাণ রেখে দিয়েছি। আমি সিইও ও আরও’কে সব জানিয়েছি। অভিযোগ কাকেই বা করব। সবাই তো বিক্রি হয়ে গেছে।’
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেও বিস্ফোরক অভিযোগ করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনে ভিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারই। আমাদের ১০০ আসন জোর করে লুঠ করা হয়েছে।’ মমতা বলেন, ‘একশ আসন জোর করে লুঠ করা হয়েছে। এসআইআর করে ভোটারদের নাম কাটা হয়েছে। এ রকম কোনো ভোটে দেখিনি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের লড়াইটা বিজেপির সঙ্গে ছিল না। আমাদের লড়তে হয়েছে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে, যারা কালো ইতিহাস তৈরি করেছে।’ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, ডেরেক ও’ব্রায়েন, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, কল্যাণ ব্যানার্জি প্রমুখ।
রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা
ভোটে বিজেপির জয়ের পর কোথাও দেখা যাচ্ছে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান, কোথাও ভাঙা হচ্ছে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়। সহিংসতায় কমপক্ষে দুজন নিহত হয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সচিবালয় নবান্নতে গতকাল মঙ্গলবার ‘জয় শ্রী রাম’ ও ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান তুলতে দেখা গেছে। নবান্নে কর্মরত সরকারি কর্মীরাই এ স্লোগান দেন। পাশাপাশি তারা আবির খেলায় মেতে ওঠেন। অন্যদিকে কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়ির দিকে যাওয়ার গলির মুখে যে সিজার ব্যারিকেড ও হাই সিকিউরিটির রিমোট কন্ট্রোল ব্যারিকেড ছিল, তা গতকাল দুপুরের দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি তাঁর ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের দপ্তরের সামনে থেকেও পুলিশি পাহারা উঠে যায়। মমতার বাড়ির এলাকায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য পুলিশি অনুমতির প্রথাও রদ করা হয়।
গত সোমবার রাতের পর মঙ্গলবারও রাজ্যটির একাধিক জায়গায় সহিংসতা ঘটেছে। বিজেপির বিরুদ্ধে শিলিগুড়িতে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। হাওড়ায় ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শ্যামল মিত্রকে বেধড়ক মারধরের ছবি সামনে এসেছে। একাধিক কলেজ ক্যাম্পাস দখলে নিয়েছে বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবিভিপি।
নিহত হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের এক কর্মী। তিনি বীরভূম জেলার নানুর সন্তোষপুর গ্রামের বাসিন্দা আবির শেখ। অভিযোগ উঠেছে, বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা তাঁকে রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় আবিরের সঙ্গে থাকা চাঁদু শেখ আহত হয়েছেন। অপরদিকে হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুরে সোমবার রাতে বিজেপির সমর্থক যাদব বরকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে উদয়নারায়ণপুরের দেবীপুর গ্রামে।
গত সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ফল ঘোষণা করা হয়। এতে বিজেপি ২০৭ আসনে জয়ী হয়। বিপরীতে তৃণমূল জয় পেয়েছে ৮০ আসনে। কংগ্রেস দুটি ও বামরা এক আসনে জয়ী হয়েছে।
