যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে কী ইরান রাজি
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ২১:৫৬ | আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ | ২৩:০০
ইরান জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। তবে শান্তি প্রস্তাবে পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে কীনা তা স্পষ্ট নয়।ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, 'তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাবের জবাব দেবে।'
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ইরান একটি চুক্তি চায়।’ বুধবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, 'গত ২৪ ঘণ্টায় খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি।'
এর একদিন আগে যুদ্ধের অবসানে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে— এমন ইঙ্গিত দিয়ে হরমুজ প্রণালিতে চালু করা ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামের অভিযান স্থগিতের ঘোষণা করেন ট্রাম্প।
হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে একটি বৈশ্বিক মন্দা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই প্রাণালি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে জোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে ইরান।
যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রস্তাবগুলো আসলে কী?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, উভয় পক্ষ ১৪ দফার একটি চুক্তির কাছাকাছি এসেছে। এই সমঝোতার অধীনে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি এবং কমপক্ষে ১২ বছর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখতে সম্মত হবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। ইরানের জব্দ করা কয়েকশ' কোটি ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেবে। চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে উভয় দেশ।
কয়েক দশক ধরে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ট্রাম্পের পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে স্বাক্ষরিত ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্প বেরিয়ে যান। পরে সেই চুক্তির আওতায় কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ইরানের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ রয়েছে।
মধ্যস্থতা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার। যদি উভয় পক্ষ প্রাথমিক চুক্তিতে সম্মত হয়, তবে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ৩০ দিনের বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে।
অনেকে মনে করেন, সমঝোতার প্রস্তাবে কোনো পক্ষই হয়তো ছাড় দেবেনা। এর আগেও ওয়াশিংটনের কিছু প্রস্তাব ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে। যেমন— ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করা।
ট্রাম্পের মিত্র ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার জানিয়েছেন, ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে বিরত রাখতে দেশটি থেকে সব ইউরেনিয়াম অপসারণ করতে হবে—এ বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন।
তবে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা সব সময় অস্বীকার করেছে। দেশটি জোর দিয়ে বলেছে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির শর্ত মেনে তেহরান কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও এই চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আমাদের একদিনেই সব চুক্তি লিখে ফেলতে হবে- এমন নয়। বিষয়টি খুবই জটিল এবং প্রযুক্তিগত। তবে আমাদের এমন একটি কূটনৈতিক সমাধান দরকার, যেখানে কোন বিষয়ে তারা আলোচনা করবেন এবং শুরুতে কতটা ছাড় দেবেন- সেসব বিষয় পরিষ্কার থাকে।’
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত একটি টেকসই ঐক্যমতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। তা সত্ত্বেও দুই পক্ষ বর্তমানে আলোচনার যে পর্যায়ে রয়েছে, তাকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রস্তাবে ইরান কী রাজি
ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের বিষয়ে ইরান এখনও আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। তবে ইরানি নেতারা এর বিরোধিতা করেছেন। ইরানের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই বলেন, 'খসড়া প্রস্তাবে বাস্তবতার চেয়ে আমেরিকার ইচ্ছার প্রতিফলন বেশি।' ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দুই পক্ষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার খবর নিয়ে উপহাস করেছেন। সামাজিকমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘অপারেশন ট্রাস্ট মি ব্রো ব্যর্থ হয়েছে।’
তেহরান থেকে আল-জাজিরার রেসুল সেরদার আতাস জানিয়েছেন, ইরান এখনও মার্কিন প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তির খবরকে স্বাগত জানাতে চায়। তবে এই পর্যায়ে তারা অতিরিক্ত কোনো তথ্য প্রকাশ করবে না। সাংবাদিক আতাস বলেছেন, 'ইরানিরা বলছেন, এই পর্যায়ে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে না। তাদের লক্ষ্য, পুরোপুরি যুদ্ধের অবসান।'
তিনি আরও বলেন, 'তেহরান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছ থেকে যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব করে। এসব শর্ত পূরণ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত ইরান।'
আল-জাজিরার সাংবাদিক আলমিগদাদ আলরুহাইদ গত মঙ্গলবার তেহরান থেকে জানান, পারমাণবিক বিষয়ে ইরান অত্যন্ত কঠোর লাইন নির্ধারণ করেছে। পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা তারা করতে চায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক কিমিটের মতে, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার জন্য ট্রাম্পের দাবি অবাস্তব। এটি তেহরানের মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, 'এবারের আলোচনায় ইরানিরা যদি কোনো বিষয়ে জোর দেয়, তবে তা হলো ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি অনুযায়ী অনুমোদিত।'
তবে কিমিটের ধারণা, ট্রাম্প হয়তো ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত দেশটির বাইরে নিয়ে যেতে পারেন। ইরান হয়ত ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে সরিয়ে নিতে রাজি, অথবা এটিকে কমিয়ে আনতে পারে। তবে আল-জাজিরার সংবাদদাতা আলরুহাইদ বলেন, ইরান এরইমধ্যে ইউরেনিয়াম অন্য দেশে সরিয়ে নিতে অস্বীকার করেছে।
ধারণা করা হয়, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ কমপক্ষে প্রায় ৪৪০ কিলোগ্রাম (৯৭০ পাউন্ড) ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা, যারা ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হয়েছিল। তারা কোনো শর্ত ছাড়াই হরমুজে নৌচলাচল পুনরুদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে আসছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালানোর পর ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালায়, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি।
ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে বারবার একটি চুক্তির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি সফল হতে পারেননি। ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের মতো বিভিন্ন কঠিন বিষয়ে দু’পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়েই গেছে।
অনুবাদ: মো. মাহমুদুল হাসান
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- হরমুজ প্রণালি
