'আমি ফেঁসে গেছি'— তিশার শেষ বার্তা ঘিরে যত প্রশ্ন
তিশা শর্মা। ছবি: সংগৃহীত
এনডিটিভি
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬ | ১৬:৩৫ | আপডেট: ১৮ মে ২০২৬ | ২১:২৫
'আমি ফেঁসে গেছি, কিন্তু তুমি ফেঁসে যেয়ো না'- একটি ছোট্ট ইনস্টাগ্রাম বার্তা, যার ভেতরে রয়েছে ভয়, অস্থিরতা ও অজানা চাপের ইঙ্গিত। ৩৩ বছরের তিশার মৃত্যুর পর এ বিষয়গুলোই ঘুরে ফিরে আসছে তদন্তে, সন্দেহের কেন্দ্রে।
তিশা শর্মাকে গত ১২ মে স্বামীর বাড়িতে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাটি শুরুতে আত্মহত্যা হিসেবে ধরা হলেও, পরিবারের অভিযোগ ও নতুন তথ্য সামনে আসার পর এটি এখন বহুমাত্রিক তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনাটি ভরতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভোপালের কাটারা হিলস এলাকার। নয়ডার মেয়ে তিশা পড়াশোনা শেষে দিল্লিতে চাকরি, ব্যস্ত শহুরে জীবন ও নিজের মতো করে এগিয়ে চলার চেষ্টায় পরিচিত পথেই হাঁটছিলেন। মার্কেটিংয়ের পাশাপাশি সুন্দরী প্রতিযোগিতা ও চলচ্চিত্রের কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালে একটি ডেটিং অ্যাপে তার পরিচয় হয় সমর্থ সিংয়ের সঙ্গে। সেই পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে সম্পর্ক, আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হয় বিয়ে।
বিয়ের পর তিশা চলে আসেন ভোপালে। নতুন জীবন, নতুন ঠিকানা, নতুন পরিচয়ের ভেতর দিয়ে শুরু হয় আরেকটা বাস্তবতা। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিশা তার মানসিক অবস্থার পরিবর্তন এবং ভেতরের অস্থিরতা নিয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করেন।
বন্ধুদের এক গ্রুপে ৭ মে তিনি লিখেন, 'আমি এখন অনেক দুশ্চিন্তায় আছি। ঘরে বসে আছি। আমি জীবনে কিছু করতে চাই। বিয়ে মানেই নিজের পরিচয় শেষ হয়ে যাওয়া নয়, যেখানেই থাকি নিজেকে নিয়ে কাজ করা উচিত।'
তিশার এই কথাগুলো শুধু অভিযোগ ছিল না- বরং ছিল নিজের অবস্থান খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। একই সঙ্গে তিনি সতর্কও করেন, 'বিয়ের সময় তাড়াহুড়া করো না, ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিও।' আরেক কথোপকথনে তিনি বলেন, 'আমি ঠিক আছি, কিন্তু বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে।'
হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে জানা যায়, তিশা তার মাকে জানিয়েছিলেন তিনি দাম্পত্য জীবনে 'আটকে আছেন' এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বার বার মাকে অনুরোধও করেন।
'মা, আমার খুব বেশি দম বন্ধ লাগছে'- মৃত্যুর কয়েকদিন আগে মাকে এই বার্তা পাঠান তিশা। গত ৭ মে আরেক বার্তায় লিখেন, 'মা, তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, কালই প্লিজ।' 'হচ্ছে আমার আর প্রয়োজন নেই'- এমন কথাও লিখেন তিশা।
স্বামী কেন তার ওপর অসন্তুষ্ট সেটি বুঝতে পারছিলেন না তিশা। মাকে সেই কথা জানিয়ে তার বাড়িতে আসার অনুরোধও করেছিলেন।
তিশার গর্ভে সন্তান এলে স্বামী সমর্থ সিং গর্ভপাত করাতে তাকে বাধ্য করান। স্বামীর অভিযোগ, ওই সন্তান তার নয়! এই কথা জানিয়ে এমবিএ ডিগ্রিধারী তিশা মাকে লিখেন, 'যে স্বামী এমন অভিযোগ করতে পারে, আমি কীভাবে তার সঙ্গে থাকব?'
৯ মে দুপুরে পাঠানো এক বার্তায় তিশা লিখেন, 'সে আমাকে জিজ্ঞেস করছে এটা কার সন্তান ছিল, আর তুমি বলছ আমি যেন এসব উপেক্ষা করি! তুমি কেমন মা! সে সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আমি কীভাবে তার সঙ্গে থাকব?'
অভিযোগ উঠেছে, তিশার মায়ের সামনে সমর্থ সিং খারাপ আচরণ না করলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সারাক্ষণ স্ত্রীকে মানসিক আঘাত ও অপমান করতেন। তিশার বার্তায় সেটি উঠে এসেছিল। একদিন তিশা মার্কে লিখেন, 'মা, আমি এখানে পাগল হয়ে যাব। আমি আর পারছি না!'
এতসব বার্তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ইনস্টাগ্রামের সেই লেখা- 'আমি ফেঁসে গেছি, কিন্তু তুমি ফেঁসে যেয়ো না।' এটি এখন যেন পুরো ঘটনার প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, মানসিক চাপ ও অজানা বাস্তবতা এক সুতোয় বাঁধা।

তিশার বার্তাগুলো প্রকাশ্যে আসার পর তার মানসিক অবস্থা, বিয়ের পর জীবনে পরিবর্তন এবং পারিবারিক চাপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রাথমিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝুলন্ত অবস্থায় তিশার মৃত্যু হয়েছে। তবে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা মৃত্যুর আগের।
পরিবারের অভিযোগ, তিশার মৃত্যুর ঘাটনাকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা সঠিক নয়। মৃত্যুর আগে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে, যার প্রমাণ তিশার শরীরে ছিল।আর ওই নির্যাতন ছিল যৌতুকের জন্য।
ঘটনাটি তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) গঠন করেছে ভোপাল পুলিশ। তবে পরিবারের সন্দেহ, প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রভাবিত করা হতে পারে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সত্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে তিশা শর্মার মৃত্যু এখন একটি ব্যক্তিগত ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তার শেষ কিছু বার্তা, পরিবারের অভিযোগ এবং তদন্তের নানা দিক- জন্ম দিয়েছে অনেক প্রশ্নের। আর সামনে এসেছে, যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে নির্যাতনের বিষয়টি।
- বিষয় :
- ভারত
- ইনস্টাগ্রাম
