কেন ইরানের সঙ্গে মানিয়ে চলতে শিখছে আরব দেশগুলো
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ | ১০:৫০
ইরান যুদ্ধের পর থেকে আরব দেশগুলোর কূটনীতি আর আগের মতো নেই। বছরের পর বছর ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করে আসছিল, ‘ইরানকে কোণঠাসা করা সম্ভব। বারবার আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় দেশটি একেবারে দুর্বল হয়ে পড়বে, আঞ্চলিক চাপে সীমিত করবে এবং মার্কিন প্রতিরোধ ব্যবস্থা দেশটিকে এগোতে দেবে না।’ কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই যুক্তি এখন পাল্টে গেছে। গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে। আগের পুরোনো আত্মবিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখা দেশগুলোর আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। দ্য ক্র্যাডলের এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য বলা হয়েছে।
বর্তমানে জিসিসির সদস্য দেশগুলো হলো– সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমান। ইরানের হামলায় এসব দেশ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধে ইরান ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির প্রতিরোধ সক্ষমতা মুছে ফেলা যায়নি। এই অবস্থায় যুদ্ধের পর ইরান সম্পর্কে আরব বিশ্বের একাংশের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে এখন যে প্রশ্নটি নীরবে দানা বাঁধছে তা হলো– পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকা ইরানের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে চলতে শেখা যায়।
‘অনাক্রমণ চুক্তি’ চায় আরব দেশগুলো
সম্প্রতি একজন আরব কূটনীতিক বলেন, ‘আরব ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলো হেলসিঙ্কি প্রক্রিয়ার (শীতল যুদ্ধের সময় পূর্ব ও পশ্চিম ব্লকের মধ্যে সংলাপ, নিরাপত্তা ও সহযোগিতা গড়ে তোলার কূটনৈতিক উদ্যোগ) আদলে একটি অনাক্রমণ চুক্তিকে স্বাগত জানাবে।’ উত্তেজনা কমাতে এবং আরেকটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধ প্রতিরোধের উপায় হিসেবে ইউরোপীয় সরকারগুলোও এই ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
তবে এই প্রস্তাবের এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা কার্যক্রম জোরালোভাবে শুরু হয়নি। এই কাঠামো নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো বৈঠকের কথা জানা যায়নি এবং কোনো সরকারি খসড়া চুক্তিও নেই। ফলে সুসংগঠিত কূটনৈতিক উদ্যোগ মিলছে না। সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিঘাত এবং এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় এই ধারণা শক্তিশালী হয়েছে– ‘পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো হয়তো আর টেকসই নয়।’
সৌদি আরব এবং বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের জন্য ইরান যুদ্ধ অনেক হিসাবনিকাশ বদলে দিয়েছে। এই যুদ্ধ সমগ্র অঞ্চলের ওপর ব্যাপক ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাও প্রকাশ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন আক্রমণ, হরমুজ প্রণালির আশপাশে বিশৃঙ্খলা এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের হুমকি দেখিয়ে দিয়েছে ইরানের সঙ্গে পরাশক্তিরা সংঘাতে জড়ালে উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা কতটা ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।
ইরানের ব্যাপারে ‘ভুল ধারণা’ ছিল দেশগুলোর
বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের অনেক দেশ প্রকাশ্যে বা গোপনে বিশ্বাস করে আসছিল, ইরানের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ শেষ পর্যন্ত দেশটির আঞ্চলিক ভূমিকা কমাবে। এমনকি দেশটিকে অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল করে তুলবে। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। যুদ্ধে ইরান কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সামরিক অবকাঠামো যথারীতি টিকে রয়েছে।
২০১৯ সালে ইরান হরমুজ শান্তি উদ্যোগ (হোপ ইনিশিয়েটিভ) নামে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। সেখানে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বাইরের শক্তির পরিবর্তে আঞ্চলিক নেতৃত্বের কথা বলা হয়েছিল। সেই সময় অনেক আরব সরকার প্রস্তাবটিকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল। তারা এটিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ভূমিকা দুর্বল করার একটি ইরানি প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখেছিল। তৎকালীন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ সেই সময়ে যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল নিজেকে সুরক্ষিত করতে পারে এবং করা উচিত।’ ইরানের যুদ্ধ সক্ষমতা অবশেষে তেহরানের প্রস্তাবটির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
