টানা বিক্ষোভের মধ্যেই ইউক্রেনের সেনাপ্রধানকে সরিয়ে দিলেন জেলেনস্কি
সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ওলেক্সান্ডার সিরস্কি। ছবি:গ্লোবাল ইমেজ/ইউক্রেন গেটি ইমেজের
বিবিসি
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ১২:৫৩ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ১৩:১৪
টানা কয়েক দিনের বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন এনেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ওলেক্সান্ডার সিরস্কিকে বরখাস্ত করে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে যুদ্ধ-অভিজ্ঞ জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতয়িকে। কয়েক দিন আগেই জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে দায়িত্ব থেকে সরানোর পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তার মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত এল।
জেলেনস্কির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের পর থেকেই ফেদোরভ ও সিরস্কির মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। ৩৫ বছর বয়সী ফেদোরভ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য প্রশংসিত ছিলেন। অন্যদিকে ৬০ বছর বয়সী সিরস্কিকে ইউক্রেনের অনেকেই পুরোনো ধাঁচের বা ‘সোভিয়েত ঘরানার’ কমান্ডার হিসেবে দেখতেন, যিনি সেনাবাহিনীতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনে অনাগ্রহী ছিলেন।
দায়িত্ব ছাড়ার আগে টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় সিরস্কি বলেন, দুই বছর আগে যে সেনাবাহিনী কঠিন প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ছিল, সেটি এখন আক্রমণাত্মক সক্ষমতা অর্জন করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তার উত্তরসূরি এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবেন।
নতুন সেনাপ্রধান মিখাইলো দ্রাপাতয়ি ফেসবুকে বলেন, দেশের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে সিরস্কির অবদানের প্রশংসা করেন এবং বলেন, তিনি এই বাহিনীর মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন।
মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুর দিকে কিয়েভ রক্ষাসহ বিভিন্ন সামরিক অভিযানে সিরস্কির ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তিনি জানান, ফেদোরভকে নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি সেটি গ্রহণ করেছেন কি না, সে বিষয়ে কিছু জানাননি।
গত সপ্তাহে ফেদোরভের স্থলাভিষিক্ত হন ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইয়েভেনি খমারা। আপাতত তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকছেন।
ডিজিটাল রূপান্তর বিষয়ক সাবেক মন্ত্রী ফেদোরভ যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রযুক্তিনির্ভর নানা উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন। তার উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘আইটি আর্মি অব ইউক্রেন’ এবং ‘আর্মি অব ড্রোনস’ কর্মসূচি। পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও ড্রোন ব্যবহারে নতুন কৌশল চালু করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা পান।
ফেদোরভকে সরিয়ে দেওয়ার পর টানা ছয় দিন বিক্ষোভ চলতে থাকে। বিক্ষোভকারীরা সেনাবাহিনীতে আরও আধুনিক নেতৃত্ব ও সংস্কারের দাবি জানান। শেষ পর্যন্ত জেলেনস্কি সিরস্কিকে সরিয়ে দ্রাপাতয়িকে নিয়োগ দেন, যাকে তুলনামূলক তরুণ, উদ্ভাবনী ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞ কমান্ডার হিসেবে দেখা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সংকট কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
ফেদোরভও নতুন সেনাপ্রধানকে অভিনন্দন জানিয়ে এই নিয়োগকে "স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের জন্য মুক্ত মানুষের লড়াইয়ে নতুন আশা" বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, সিরস্কির সঙ্গে ফোনে কথা বলে কিয়েভ রক্ষা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তাঁর অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, ইউক্রেনকে এখন আরও দ্রুত এগোতে হবে এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করতে হবে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে সিরস্কি ফেদোরভের সঙ্গে সম্পর্ককে পেশাগত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সামরিক চুক্তি, অস্ত্র সংগ্রহ ও সেনা সমাবেশের মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। তাঁর ভাষায়, "যুদ্ধের জয় আসে বাস্তব কাজের মাধ্যমে, স্লোগান বা প্রচারণার মাধ্যমে নয়।"
এদিকে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি নতুন সেনাপ্রধান দ্রাপাতয়ি এবং ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী খমারাকে একটি নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এতে সেনাবাহিনীর কোর কাঠামো সংস্কার, অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানোর বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে।
- বিষয় :
- ইউক্রেন
- সামরিক বাহিনী
- বরখাস্ত