লন্ডনের মঞ্চে ‘নকশী কাঁথার মাঠ’
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ১৪:১২
পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে মঞ্চস্থ হলো পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ অবলম্বনে নির্মিত নৃত্যনাট্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’। ১৯ জুলাই সাউথ এশিয়ান হেরিটেজ মান্থের অংশ হিসেবে বাফা ইউকে পরিবেশম করে রুপাই ও সাজুর প্রেম, বিচ্ছেদ, বেদনা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার হৃদয়স্পর্শী এ কাহিনী।
রঙিন লোকজ পোশাক, আবহসংগীত, গ্রামীণ পটভূমি এবং ছন্দময় নৃত্যশৈলীর মধ্য দিয়ে পূর্ব লন্ডনের নগরপরিসরে কিছু সময়ের জন্য সৃষ্টি হয় বাংলার পল্লিজীবনের এক আবেগঘন পরিবেশ। পরিবেশনার প্রতিটি পর্বে দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয় প্রেম, বিচ্ছেদ, অপেক্ষা এবং স্মৃতিকে শিল্পে রূপান্তরের এক গভীর মানবিক আখ্যান।
বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস—বাফা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৫৫ সালের ১৭ মে ঢাকায় বেগম আফরোজা বুলবুলের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে সংগীত, নৃত্য ও চারুকলার চর্চা ও প্রসারে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের বাইরে বাফার একমাত্র স্বীকৃত শাখা হিসেবে ২০২৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে বাফা ইউকে। সম্প্রতি বাংলাদেশে মূল প্রতিষ্ঠানটির ছয় যুগ পূর্তি উদ্যাপিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বাফা ইউকে বাফার ছয় যুগ পূর্তি এবং পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ১২৩তম জন্মবার্ষিকী স্মরণে ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ মঞ্চে আনে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মনোরম পিয়ানোর সুরে দর্শকদের স্বাগত জানান বাফা ইউকের তরুণ পিয়ানো শিক্ষক আয়হাম শাহিদ। বাফার প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও একসময়ের জনপ্রিয় তারকা রুকশানা হাসি সোনিয়া এবং আয়হাম শাহিদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় শুরু হয় আয়োজনের আনুষ্ঠানিক পর্ব। পরে মঞ্চে এসে উপস্থিত দর্শকদের স্বাগত জানান বাফা ইউকের প্রিন্সিপাল রুবাইয়াত শারমিন ঝরা। প্রধান অতিথি হিসেবে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ওয়ালিদ মোহাম্মদ।
‘নকশী কাঁথার মাঠ’ শুধু একটি প্রেম ও বিচ্ছেদের কাহিনি নয়; এর ভেতরে নিহিত রয়েছে বাংলার গ্রামীণ সমাজ, লোকসংস্কৃতি, মানবিক সম্পর্ক এবং নারীর নীরব বেদনার এক গভীর দলিল। এই কাব্যের প্রতিটি স্তরে গ্রামবাংলার মানুষের জীবন, অনুভূতি ও সামাজিক বাস্তবতা ধরা পড়ে। বাফা ইউকের পরিবেশনায় সেই সাহিত্যিক আবেগকে নৃত্যের ভাষায় মঞ্চে রূপ দেওয়ার চেষ্টা ছিল স্পষ্ট।
নৃত্যনাট্যের প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় ও নৃত্য পরিবেশন করেন বিলেতের স্বনামধন্য নৃত্যশিল্পী মনিরুল ইসলাম মুকুল এবং রুবাইয়াত শারমিন ঝরা। রুপাই ও সাজুর প্রেম, বিচ্ছেদ ও অপেক্ষার আবেগ তাঁরা নৃত্যভঙ্গি ও অভিব্যক্তির মাধ্যমে মঞ্চে তুলে ধরেন। তাঁদের সঙ্গে নৃত্যনাট্যে আরও অংশ নেন মেহবুবা লিথি, জিয়াউর রহমান সাকলাইন, গঙ্গা রায়, শুভ ঘোষ, রওনক আলভি, রাইসা কথা, শাকিল আহমেদ সনেট, আবুল কাশেম, সুজাতা, বাফা ইউকের শিক্ষার্থী দেবিনা রায় এবং বাফা ইউকের নৃত্য প্রশিক্ষক কাজী ফারহানা আক্তার।
শিশুশিল্পী হিসেবে অংশ নেয় আজান, জায়ান, তিহান ও আরযো। তাদের উপস্থিতি ও স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশনা নৃত্যনাট্যে প্রাণবন্ততা যোগ করে। বিভিন্ন বয়সের শিল্পীদের অংশগ্রহণে পুরো মঞ্চায়নটি হয়ে ওঠে একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক প্রয়াস।
অনুষ্ঠানের কারিগরি সহায়তায় ছিলেন শায়লা শারমীন। মঞ্চ ও নেপথ্য ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেন শাকিল আহমেদ সনেট ও আবুল কাশেম। পোশাক ও প্রপসের দায়িত্বে ছিলেন মেহবুবা লিথি এবং রুকশানা হাসি সোনিয়া। ইভেন্ট সমন্বয় করেন মেসবাহ শাহীদ। আয়োজনটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন রুবাইয়াত শারমিন ঝরা, মেহবুবা লিথি, শায়লা শারমীন, মাসুদ জামান, ঈহান শহীদ ও অনন্ত কাশেম। আলোকচিত্র ও ভিডিও ধারণ করেন মাহবুব রেজা চৌধুরী।
পূর্ব লন্ডনে বসবাসরত বাংলাদেশি এবং দক্ষিণ এশীয় দর্শকদের সামনে বাফা ইউকের এই আয়োজন স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি হলেও শিকড়, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সহজে বিচ্ছিন্ন হয় না। বরং শিল্পের মাধ্যমে সেই সম্পর্ক নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন ভাষায় ফিরে আসে।
- বিষয় :
- লন্ডন
- পল্লীকবি জসীমউদ্দীন