বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সুপারিশ ইকোসকের
ফাইল ছবি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৩৫ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ | ১৫:৩৯
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে টেকসই ও নির্বিঘ্ন উত্তরণ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কাছ থেকে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর সুপারিশ চেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে ইকোসক এ বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘে ইকোসকের বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেয়। আজ বুধবার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। ইকোসক নেপালের এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়েও একই সুপারিশ করেছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
বৈঠকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী বাংলাদেশ ও নেপালের পক্ষে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধের পটভূমি, প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল অপরিহার্য।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আজ বুধবার ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় ইকোসকের সভায় বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে প্রস্তুতিকাল কত দিনের জন্য বাড়ানো যায়, তার সুপারিশ করা হবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণের আবেদন জানায়। গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক চিঠিতে এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের ব্যক্তিগত সহযোগিতা চান। গত জুনে সিডিপি বাংলাদেশের উত্তরণ পেছানোর আবেদনকে সমর্থন জানালেও কত দিনের জন্য সময় বাড়ানো উচিত, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সুপারিশ করেনি।
স্থায়ী মিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশ ও নেপালের আবেদন পর্যালোচনা করে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থাপনের জন্য সিডিপিও মত দিয়েছিল। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী ২৪ নভেম্বরের আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সাধারণ পরিষদকে অনুরোধ করেছে ইকোসক। ওই তারিখে বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি থেকে উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।
গত শুক্রবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইকোসকের সভাপতি ও নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লোক বাহাদুর থাপা এবং ইকোসকের সহসভাপতি ও আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন।
বাংলাদেশের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে। এর আগে গত ২ জুলাই ঢাকায় কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এবং ৯ জুলাই নেপালের কাঠমান্ডুতে ইকোসকের সভাপতির সঙ্গেও একই বিষয়ে আলোচনা হয়।
এসব বৈঠকে সরকারের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা অভিঘাতের কারণে অর্থনীতি একাধিক সংকটের মুখে পড়ে। ফলে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের নীতি হলো— উত্তরণের কারণে কোনো দেশের অর্জিত উন্নয়ন যেন ব্যাহত না হয়। কিন্তু গত চার বছরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতিতে উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকার আরও বলেছে, নতুন প্রশাসন একটি নাজুক অর্থনীতি পেয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি কাটিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন। তাই তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা নয়; বরং সুষ্ঠু, সুপরিকল্পিত ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই করা হয়েছে।
সরকারের মতে, পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল মূলত কোভিড-১৯ পরবর্তী পুনরুদ্ধার এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ধারাবাহিক দেশীয় ও বৈশ্বিক সংকট, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন কারণে সরকারের মনোযোগ দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীভূত হয়। এতে প্রয়োজনীয় আর্থিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
সরকার জানিয়েছে, প্রস্তুতিকাল বাড়ানো হলে সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে ‘থ্রি আর’ শীর্ষক পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশল বাস্তবায়ন করা হবে। এ কৌশলের আওতায় আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও সুশাসন জোরদার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও ব্যবসা সহজীকরণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাজস্ব খাতের সংস্কার এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।