ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

৩০ বছর পর এভারেস্টের ‘গ্রিন বুটস’ ফিরতে পারেন বাড়ি

৩০ বছর পর এভারেস্টের ‘গ্রিন বুটস’ ফিরতে পারেন বাড়ি
×

ছবি: বিবিসি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:০৫

এভারেস্টের চূড়ার কাছাকাছি ৩০ বছর ধরে বরফের নিচে পড়ে থাকা এক মৃত পর্বতারোহীর দেহ এবার হয়তো বাড়ি ফিরতে পারে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (আইটিবিপি) এ জন্য একটি বিশেষ উচ্চতাভূমি উদ্ধারকারী দল খুঁজছে।

এভারেস্টে পড়ে থাকা ওই মৃতদেহটি পর্বতারোহীদের কাছে ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, দেহটি ১৯৯৬ সালে এভারেস্টে নিহত ভারতীয় পর্বতারোহী তেসওয়াং পালজোরের। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্ধারকারী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানে ধারণা করা হচ্ছে, দেহটি আসলে আরেক ভারতীয় পর্বতারোহী দর্জে মোরুপের।

দেহটি এভারেস্টের প্রায় ৮ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায়, চূড়ার কাছাকাছি একটি পাথরের খাঁজের নিচে পড়ে আছে। সেখানে বছরের পর বছর বরফে জমে থাকা ওই দেহটি এভারেস্টে ওঠার পথে পর্বতারোহীদের জন্য এক ধরনের ভয়াবহ চিহ্ন হয়ে আছে।

তুষারঝড়ে প্রাণ হারান তিনজন
১৯৯৬ সালে এভারেস্টে ওঠার জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একটি ঐতিহাসিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন দর্জে মোরুপ। লক্ষ্য ছিল চীনের নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের দিক দিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠা। এটি ছিল ওই দিক দিয়ে প্রথম ভারতীয় অভিযান।

অভিযানে ছিলেন ছয়জন পর্বতারোহী। তুষারঝড়ের কারণে তিনজন ফিরে আসেন। মোরুপ ও তার দুই সহযাত্রী তেসওয়াং স্মানলা ও তেসওয়াং পালজোর চূড়ার দিকে এগিয়ে যান। তারা ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার উচ্চতার চূড়ায় পৌঁছাতেও সক্ষম হন।

তবে নামার সময় ভয়াবহ তুষারঝড় আঘাত হানে। ওই ঝড়েই তিনজনের মৃত্যু হয়।

এভারেস্ট অঞ্চলে গত এক শতকে ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাদের অনেকের দেহ এখনো পাহাড়ে পড়ে আছে। মোরুপের দেহ বলে ধারণা করা ‘গ্রিন বুটস’ও গত ৩০ বছর ধরে সেখানেই পড়ে আছে।

কীভাবে বদলাল পরিচয়
দীর্ঘদিন ধরে ‘গ্রিন বুটস’কে তেসওয়াং পালজোরের দেহ বলে মনে করা হতো। কিন্তু ১৯৯৬ সালের অভিযানে বেঁচে যাওয়া সদস্যদের বক্তব্য এবং অভিযাত্রীদের শেষ রেডিও যোগাযোগের অবস্থান বিশ্লেষণ করে এখন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ধারণা, দেহটি দর্জে মোরুপের।

আইটিবিপির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোরুপের পোশাক ও পর্বতারোহণের সরঞ্জাম পরীক্ষা করে দেহটি শনাক্ত করার বিষয়ে কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

তবে পরিচয় নিশ্চিত করতে দেহটি ভারতে ফিরিয়ে আনার পর ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।

উদ্ধার করা কতটা কঠিন
এভারেস্ট থেকে মৃতদেহ উদ্ধার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ। মোরুপের দেহ যে এলাকায় রয়েছে, সেটি পর্বতারোহীদের ভাষায় ‘ডেথ জোন’। সেখানে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় সেখানে অক্সিজেনের পরিমাণও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

নেপালের বিশিষ্ট পর্বতারোহী তশিরিং জাংবু শেরপা বলেন, আবহাওয়া ও তুষারের পরিস্থিতি উদ্ধার অভিযানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। এভারেস্টের উত্তর দিক তুলনামূলকভাবে কম ফাটলযুক্ত হলেও সেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।

পর্বতারোহী গাইড পেম্বা ওংচু শেরপা বলেন, জনপ্রিয় বসন্ত মৌসুমেও ওই দেহ নামিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য চূড়ায় ওঠার সক্ষমতা থাকা ১০ থেকে ১২ জন পর্বতারোহীর প্রয়োজন হতে পারে।

মৃতদেহটি এমন উচ্চতা থেকে নামিয়ে প্রথমে হেলিকপ্টারে নেওয়া সম্ভব এমন জায়গায় পৌঁছাতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইয়াক ব্যবহার করার সম্ভাবনাও থাকে। বরফে জমে থাকা দেহ সাধারণ মানুষের তুলনায় কয়েক গুণ ভারী হয়ে যেতে পারে। আবার নিচের উচ্চতায় নামানোর পর দেহ গলতে ও পচতে শুরু করতে পারে।

ভারতীয় পর্বতারোহী কুনতাল জোইশার বলেন, দেহ নামানোর শুরুর প্রায় এক হাজার মিটার পথই সবচেয়ে কঠিন হতে পারে। খাড়া পাথুরে পথ দিয়ে দেহ নামাতে গিয়ে উদ্ধারকারী শেরপাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

এ ধরনের উদ্ধার অভিযানে বিপুল অর্থও প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলনামূলক সহজ উদ্ধার অভিযানেও ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

সেপ্টেম্বরে মরদেহ ফেরানোর লক্ষ্য
দর্জে মোরুপের দেহ উদ্ধারের অর্থায়ন করছে আইটিবিপি। বাহিনীটি আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে উদ্ধার অভিযান শেষ করতে চায়। এ জন্য উচ্চতাভূমিতে মৃতদেহ উদ্ধারে অভিজ্ঞ শেরপা দল খোঁজা হচ্ছে।

ভারতে দেহটি ফিরিয়ে আনার পর ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পরিচয় মোরুপের বলে নিশ্চিত হলে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

‘আমি বিশ্বাস করিনি সে মারা গেছে’
মোরুপের স্ত্রী কনচাক ইয়াংস্কিটের কাছে স্বামীর মৃত্যুর খবর মেনে নেওয়া এত সহজ ছিল না। কারণ, তিনি কখনো তার মরদেহ দেখেননি।

মোরুপ এভারেস্ট অভিযানে যাওয়ার আগের রাতে স্ত্রীকে বলেছিলেন, তিনি নায়ক হয়ে ফিরবেন এবং দেশের গর্ব হবেন। স্ত্রীকে সন্তানদের যত্ন নিতে এবং দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে যেতে বলেছিলেন তিনি।

ইয়াংস্কিট বলেন, অভিযানের সময় পাহাড়ে ঝড়ের খবর তিনি পেয়েছিলেন। বাড়িতে স্বামীর জন্য শেষকৃত্যের প্রার্থনাও করা হয়েছিল। কিন্তু তার মন কখনো বিশ্বাস করতে চায়নি যে মোরুপ মারা গেছেন।

তার ভাষ্য, ‘আমি তার মৃতদেহ দেখিনি। তাই বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।’

মোরুপের পরিবারের কাছে এখন তার কয়েকটি ছবি, পদক ও পুরস্কার এবং চীন সরকারের দেওয়া একটি সনদ রয়েছে। ওই সনদে উল্লেখ আছে, ১৯৯৬ সালের ১০ মে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় মোরুপ এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন।

মোরুপের ছেলে পাঞ্চক দর্জাই জানিয়েছেন, দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলে লাদাখের রাজধানী লেহর মার্টিয়ার্স পার্কের কাছে তার বাবার শেষকৃত্য করা হবে। তিনি বলেন, তার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, তাই তাকে শহীদ হিসেবে স্মরণ করা উচিত।

তবে পরিবারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্নটি হবে অন্য কিছু। মোরুপের ছেলে বলেন, তাদের বাড়িতে এভারেস্টে ওঠার সনদের পাশে ‘গ্রিন বুটস’-এর স্মৃতিও সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

×