হরমুজে ইরানের রকেট লঞ্চারে প্রথমবারের মতো হামলা যুক্তরাষ্ট্রের
হরমুজ প্রণালি। ছবি:রয়টার্স
এপি
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫৭ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১২:০৮
ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের মধ্যে প্রথমবারের মতো হরমুজ প্রণালিতে ইরানের রকেট লঞ্চারগুলোতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এক মাসের মধ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সামরিক পদক্ষেপ। এর মধ্য দিয়ে সংঘাতের সাময়িক বিরতি ভেঙে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
রোববারের ওই হামলার পর ইরান প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। পরে ইরানের পক্ষ থেকে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথা জানানো হয়। জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, সোমবার ভোরে দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সদস্যদের হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র-মাইন পাতা এবং রকেট নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। এর আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের পথ থেকে সমুদ্র-মাইন অপসারণের কাজ শেষ করেছিল।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, প্রণালিতে অবস্থিত লারাক দ্বীপের কাছে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছে, হামলায় তাদের কয়েকজন সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের দৃশ্য প্রচার করা হয়। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব হিসেবে জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা ইরানের ‘আগ্রাসন’ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, হামলাটি ছিল মাইন ও বিস্ফোরক পেতে নিয়োজিত বাহিনীর বিরুদ্ধে সীমিত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, বেসামরিক নাবিক, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এবং বিশ্ববাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ রক্ষার জন্য এই হুমকি দূর করা হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা চলছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণকে কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্তমানে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী তুলনামূলক কমসংখ্যক জাহাজ ঝুঁকি নিয়ে এই পথে চলাচল করছে।
এর আগে সর্বশেষ ২৯ জুলাই মার্কিন বাহিনী ইরানের উপকূলীয় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা কেন্দ্রসহ রেভল্যুশনারি গার্ডের ডজনখানেক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল। পরে ১ আগস্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনুরোধে তিনি নতুন হামলা না চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলের কথা ঘোষণা করে। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে মার্কিন গোলাবারুদের মজুদ কমে আসা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতির ওপর এর প্রভাব নিয়েও প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছেন, ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি কোনো তাড়াহুড়ো করছেন না। একই সময়ে তিনি দাবি করে আসছেন, ইরানের নেতৃত্ব চরম সংকটের মুখে রয়েছে। তবে গত এক মাসে দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা পদে কয়েকটি নিয়োগ থেকে তেহরানের অনমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে দেশটির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতির পরিমাণ ২৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার নেতৃত্বের কাঠামোর বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও পড়েছে। রোববার যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৪ দশমিক ৯৪ ডলারে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ৮৯ দশমিক ৭৯ ডলারে পৌঁছায়।
ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে বলে দাবি করলেও যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করা এই জলপথে গত সপ্তাহে মাত্র ২৪টি জাহাজ চলাচল করেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি বহুজাতিক জোটও জানিয়েছে, প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম।
এদিকে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর পরিচালিত একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালিতে ওমানের খাসাব শহরের উত্তরে একটি ট্যাঙ্কার জাহাজে অজ্ঞাত কোনো প্রজেক্টাইল বা বস্তুর আঘাত লাগে। এতে কোনো হতাহত বা পরিবেশগত ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পক্ষ এ ঘটনার দায় স্বীকার করেনি।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রোববার পর্যন্ত ইরানের বন্দর অবরোধের কারণে তারা ৮৩টি বাণিজ্যিক জাহাজের পথ পরিবর্তন করেছে এবং তিনটি জাহাজ অচল করে দিয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।