ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

পশ্চিম তীরে জলপাইবাগান ধ্বংস

‘যে গাছ ও জমি হারিয়েছি, সেগুলো আমাদের সারাজীবনের জীবিকার উৎস ছিল’

‘যে গাছ ও জমি হারিয়েছি, সেগুলো আমাদের সারাজীবনের জীবিকার উৎস ছিল’
×
×

ছবি: মিডল ইস্ট আই

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৫০ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:১৬

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে জলপাইগাছ ও কৃষিজমি ধ্বংসে নতুন করে অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সামরিক নির্দেশ জারি করে বুলডোজার দিয়ে গাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর আগে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

রামাল্লার উত্তর-পশ্চিমে দেইর নিজাম এলাকায় নিজের বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে সালেহ তামিমি দেখছিলেন উপড়ে ফেলা জলপাইগাছগুলোর ধ্বংসাবশেষ। শিকড়সহ গাছগুলো উপড়ে পড়ে আছে। পড়ে থাকা ডালপালা, পাথর ও মাটির স্তূপের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ইসরায়েলি বুলডোজার আমার জমিতে এসে গাছগুলো ধ্বংস করেছে।’

একটি লেবুগাছ দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এই লেবুগাছটি তাদের কী ক্ষতি করেছে?’ এরপর একটি জলপাইগাছের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন এই জলপাইগাছে পানি দিতাম।’

তামিমির বাড়িও ভাঙার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। তামিমি বলেন, ‘তারা আমাদের উচ্ছেদ করতে চায়। আমার যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই। তারা বাড়ি ধ্বংস করলেও আমি এখান থেকে যাব না।’

তামিমির ঘটনা পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমি ও জলপাইবাগান ধ্বংসের বৃহত্তর একটি অভিযানের অংশ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এক বছরে বেড়েছে গাছ কাটার সামরিক নির্দেশ
ফিলিস্তিনের ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাছ ও অন্যান্য উদ্ভিদ ধ্বংসের জন্য ৫৫টি সামরিক নির্দেশ জারি করা হয়েছে। এসব নির্দেশের আওতায় পড়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৭৩ দুনাম জমি।

২০২৫ সালের পুরো বছরে এ ধরনের ৪৭টি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। তখন এসব নির্দেশের আওতায় পড়েছিল ১ হাজার ৬১৩ দুনাম জমি।

গত ২০ সেপ্টেম্বর দেইর নিজামের কাছে একটি গুলির ঘটনায় এক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী নিহত হওয়ার পর গ্রামের প্রায় ৯৯ দশমিক ৭৯ দুনাম জমির গাছপালা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে কমিশন জানিয়েছে। নির্দেশে জলপাইসহ অন্যান্য গাছ উপড়ে ফেলার কথা বলা হয়।

এর চার দিন পর আরও প্রায় ৯৪ দশমিক ৭৯ দুনাম জমির গাছ কাটার নির্দেশ দেওয়া হয়। জমির মালিকদের নিজেদের উদ্যোগে ১২ ঘণ্টার মধ্যে গাছ সরিয়ে ফেলার সময় দেওয়া হয়েছিল।

দেইর নিজামের আরেক জমির মালিক নাথির তামিমি বলেন, আমার পরিবারের প্রায় ২৪ দুনাম জমিতে জলপাইগাছ রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব গাছ আমাদের পরিবারের মালিকানাধীন জমিতে ছিল। সম্প্রতি ইসরায়েলি বাহিনী আমাদের প্রায় আট দুনাম জমির গাছ বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করেছে। আশপাশের জমিও এর আওতায় পড়েছে।

নিজামের দাবি, এলাকায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১৪০ দুনাম জমির গাছপালা পরিষ্কার করা হয়েছে।

জলপাই সংগ্রহের মৌসুমের আগেই বিপর্যয়
গত ২৪ সেপ্টেম্বর রামাল্লার উত্তর-পশ্চিমে বেইত রিমা এলাকায় প্রায় ৩১ দুনাম ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে বুলডোজার চালানো হয়। এতে ৪০০টির বেশি জলপাইগাছ উপড়ে ফেলা হয়।

এর দুই দিন আগে ওই গাছগুলো সরিয়ে ফেলার জন্য সামরিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

৬১ বছর বয়সী হাজেম রিমাওয়ি বলেন, আমার তিন দুনাম জমির গাছগুলোতে তখন জলপাই ধরেছিল। কয়েক ঘণ্টার অভিযানে কয়েক দশকের পরিশ্রম শেষ হয়ে গেছে। 

রিমাওয়ি বলেন, ‘এই জমি ও জলপাইগাছ ছাড়া আমার জীবিকার আর কোনো উৎস নেই। গাছ উপড়ে ফেলার পর এই জমি দিয়ে এখন কী করব?’

বেইত রিমার আরেক বাসিন্দা আফরাহ সানাফ বলেন, ২২ সেপ্টেম্বর আমাদের এলাকায় গাছ সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। পরে আমরা পৌরসভায় গিয়ে মানচিত্র পরীক্ষা করে জানতে পারি, আমাদের জমিও ওই নির্দেশের আওতায় রয়েছে।

সানাফের জমিতে প্রায় ১৩৮টি জলপাইগাছ ছিল। অনেক গাছই কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে রয়েছে। ৬৩ বছর বয়সী সানাফ জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি এসব গাছ দেখে আসছেন।

জমির মালিকদের ১২ ঘণ্টার মধ্যে নিজেদের হাতে গাছ উপড়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সানাফ বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই আমরা নিজেদের হাতে লাগানো গাছ উপড়ে ফেলতে রাজি হইনি।’

‘আমরা এই মাটিতে শিকড় গেড়ে আছি’
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রামাল্লার দক্ষিণ-পশ্চিমে বেইত উর আল-ফুকা এলাকায়ও ইসরায়েলি বুলডোজার দিয়ে জলপাই ও বনজ গাছ উপড়ে ফেলা শুরু হয়।

এর আগে গাছ লাগানো ২৯ দুনাম ফিলিস্তিনি জমি নিয়ে একটি নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। গ্রামের কাছে একটি ইসরায়েলি চেকপয়েন্টে এক ফিলিস্তিনি গাড়ি নিয়ে হামলা চালানোর দুই দিন পর ওই নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় এক ইসরায়েলি সেনা আহত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

গ্রাম পরিষদের প্রধান আলী সামারা বলেন, বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করা জমির পরিমাণ প্রায় ৬০ দুনামে পৌঁছেছে। অভিযান চলতে থাকলে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি জলপাইগাছ উপড়ে ফেলা হতে পারে। এসব গাছের কোনো কোনোটি ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো।

রামাল্লার উত্তর-পূর্বে কাফর মালিকেও ৫৬ দুনামের বেশি জমি নিয়ে সামরিক নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সেখানেও গাছপালা ও জলপাইগাছ সরিয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে।

অক্টোবরে সাধারণত ফিলিস্তিনে জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরু হয়। এর ঠিক আগে একের পর এক জলপাইগাছ ধ্বংস হওয়ায় কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ শুধু চলতি বছরের ফসলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ফলন দেওয়ার উপযোগী হতে নতুন জলপাইগাছের কয়েক বছর সময় লাগে।

সানাফ বলেন, ‘আমরা যে গাছ ও জমি হারিয়েছি, সেগুলো আমাদের সারাজীবনের জীবিকার উৎস ছিল।’

গাছ উপড়ে ফেলার পাশাপাশি কৃষিজমির সোপান ও উপরিভাগের মাটি নষ্ট হওয়া এবং জমিতে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ ভবিষ্যতে এসব জমি চাষের উপযোগিতা আরও কমিয়ে দিতে পারে।

নাথির তামিমি বলেন, এতে শুধু যাদের জমি ধ্বংস হয়েছে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না; পুরো এলাকার ওপর এর প্রভাব পড়ছে। তার ভাষ্য, সবুজ জলপাইবাগানের জায়গায় এখন গাছশূন্য বিস্তীর্ণ জমি দেখা যাচ্ছে।

জমির মালিকদের উচ্ছেদ করতেই গাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছে বলে মনে করেন নাথির। তবে তারা নিজেদের জমি ছেড়ে যাবেন না বলেও জানান তিনি।

‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া জলপাইগাছের মতোই- এই মাটিতে আমাদের শিকড় গেড়ে আছে,’ বলেন নাথির।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

আরও পড়ুন

×