জলের কোলে বাঁশের কাব্য
হাসান মাহমুদ রিপন
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০১ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষার নতুন জলে যখন গ্রামবাংলার খাল-বিল, নদী-নালা আর হাওর-বাঁওড় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন গ্রামীণ জনপদে শুরু হয় মাছ ধরার উৎসব। প্রাচীনকাল থেকেই এই মাছ ধরার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো বাঁশের তৈরি বিশেষ এক ধরনের ফাঁদ, যা সবার কাছে ‘চাঁই’ নামে পরিচিত। মুলি কিংবা মোড়ল বাঁশের নিপুণ বুননে তৈরি এই চাঁই কেবল একটি সাধারণ ফাঁদ নয়, এটি গ্রামবাংলার শত বছরের লোকজ সংস্কৃতি ও ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পের অনন্য নিদর্শন।
গ্রীষ্মের শেষ থেকে শুরু করে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত নদীমাতৃক বাংলাদেশে চাঁই দিয়ে মাছ ধরার ধুম পড়ে যায়। তবে কালের আবর্তনে, জলবায়ুর পরিবর্তন, দূষণ ও প্লাস্টিকের আগ্রাসনে বাঁশের বুননে তৈরি চাঁইয়ের ব্যবহার আজ অনেকটাই কমেছে। অঞ্চলভেদে মাছ ধরার এই উপকরণের রয়েছে নানা নাম। কোথাও এটি উইন্না, কোথাও ঘুনি চাঁই, কইয়া চাঁই, গুটি চাঁই আবার কোথাও জিহ্বা চাঁই নামে পরিচিত। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে এটি ‘কুই’ নামে সমাদৃত, যা আকারে বেশ বড় এবং মূলত চিংড়ি ধরার কাজে ব্যবহৃত হয়। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে এটিকে বলে বাইড়। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হলেও মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে রয়েছে এর ব্যাপক চাহিদা ও উৎপাদন।
চাঁইয়ের গঠনশৈলী অত্যন্ত চমকপ্রদ। এর ভেতরে মাছ ঢোকার রাস্তা থাকে বেশ প্রশস্ত, কিন্তু বের হওয়ার কোনো পথ থাকে না। মাছকে প্রলুব্ধ করার জন্য চাঁইয়ের ভেতরে টোপ হিসেবে দেওয়া হয় শামুক-ঝিনুকের ভাঙা অংশ কিংবা ভাত ও ধানের কুঁড়া দিয়ে তৈরি বিশেষ এক ধরনের মণ্ডা। জমির আইল কেটে কিংবা নদীর তীরে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে চাঁই বেঁধে রাখলে স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা বাইন, কই, শিং, মাগুড়, পুঁটি, খলিসা আর চিংড়ি সহজেই এতে আটকা পড়ে।
চাঁই তৈরি একটি অত্যন্ত সৃজনশীল ও শ্রমসাধ্য কাজ। একটি চাঁই পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে প্রায় আটটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমে সিলেট বা চট্টগ্রাম থেকে আনা মুলি বা রকাই বাঁশ কেটে কাঠি ও শলা তৈরি করা হয়। এরপর সেই শলা রোদে শুকিয়ে পা দিয়ে ডলে মসৃণ করে শুরু হয় বুনন। শক্ত সুতার গাঁথুনি আর নিখুঁত ফিটিংয়ের মাধ্যমে তৈরি হয় বিভিন্ন আকৃতির খোপ। একটি মুলি বাঁশ দিয়ে সাধারণত ছোট মাছ ধরার চারটি চাঁই হয়, অন্যদিকে একটি মোড়ল বাঁশ দিয়ে কুঁচে মাছ ধরার ২৫টি চাঁই তৈরি করা সম্ভব। আকারভেদে প্রতিটি চাঁই ১০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ পৌরসভার সাহাপুর, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের সাতভাইয়া পাড়া ও রামগঞ্জ গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবার বংশপরম্পরায় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। সোনারগাঁয়ের গ্রামগুলোতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাই মূলত চাঁই তৈরির প্রধান কারিগর। গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে তারা নিবিষ্ট মনে চাঁই বুননের কাজ করেন। চাঁই কারিগর মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘পুরো চাঁই একজন তৈরি করেন না। একেকজন একেক অংশ তৈরি করেন। কেউ শলা কাটেন, কেউ বুনন করেন, আবার কেউ কর্নার বাঁধেন।’ আরেক কারিগর বানু সরকার জানান, তিনি এই কাজ করে বছরে অন্তত ৩০ হাজার টাকা বাড়তি আয় করছেন।
শুধু নারীরাই নন, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিশু-কিশোররাও যুক্ত এই কাজে। বৈদ্যেরবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সূচনা রানী যেমন স্কুল ছুটির পর বাবা-মাকে এই কাজে সাহায্য করে, ফলে তাদের আলাদা কোনো শ্রমিক রাখতে হয় না।
একসময় বর্ষায় খাল-বিল পানিতে টইটম্বুর থাকত, মাছে ভরে যেত চারপাশ। কিন্তু নদীদূষণ, নাব্য হ্রাস এবং খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন প্রচণ্ডভাবে কমে গেছে। মাছ না থাকায় জেলেদের চাঁই পাতার আগ্রহও কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চাঁইয়ের চাহিদায়।
৬৭ বছর বয়সী রজ্জব আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘পাঁচ বছর বয়সে মা-বাবার কাছ থেকে এই কাজ শিখেছি। ৬০ বছর ধরে চাঁই বানাচ্ছি। একসময় এই পেশায় যে সম্মান আর লাভ ছিল, আজ তা নেই। শত অভাবের পরও বাপ-দাদার পেশাটি শুধু মায়ায় জড়িয়ে ধরে আছি।’