ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সন্ধ্যার বুকে ভাসমান ধান-চালের হাট

সন্ধ্যার বুকে ভাসমান ধান-চালের হাট
×

বরিশালের বানারীপাড়ায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান ধানের হাট

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১০ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভোরের আলো ফুটতেই সন্ধ্যা নদীর বুকে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়। চারপাশ থেকে ছুটে আসে শত শত ছোট-বড় ডিঙি ও ট্রলার। নদীর স্নিগ্ধ হাওয়ায় মিশে যায় মানুষের কোলাহল, দাঁড় টানার ছপছপ শব্দ আর ধান-চাল মাপার খসখস আওয়াজ। এক নৌকায় হয়তো চলছে ধানের দরদাম, তো ঠিক পাশে অন্য নৌকায় মাপা হচ্ছে চকচকে চাল। ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি, বস্তা টানাটানি আর নগদ লেনদেন–সবকিছুই চলছে নদীর বুকে ভাসমান নৌকায়। বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীর বুকে বসা ধান-চালের এ ভাসমান হাট কেবল একটি বাজার নয়, এটি যেন আবহমান বাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এক জীবন্ত ক্যানভাস।

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রমত্তা সন্ধ্যা নদীর তীরে ধান-চালের এই ভাসমান বাণিজ্যের বয়স প্রায় ২০০ বছর। একসময় নদীর দুই পাশে সারি সারি ধান-চালের আড়ত ও চালকল ছিল। মোল্লা, ব্যাপারী, মৃধা, সরদারসহ বিভিন্ন উপাধিধারী ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও নদীর বুকে নৌকায় নৌকায় বেচাকেনার সেই আদি রীতি আজও টিকে আছে।

বানারীপাড়ার নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘বালাম চাল’। সরু, লম্বাটে ও সুগন্ধি এই চালের একসময় দেশজুড়ে ব্যাপক কদর ছিল। বালামের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের ধান ও চাল বেচাকেনা হয় এখানে। তবে এই হাটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলেন ‘কুটিয়াল’রা।

ধান কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে চালে রূপান্তরের কারিগরদের স্থানীয় ভাষায় কুটিয়াল বলা হয়। নৌকায় ধান কিনে প্রথমে তা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর ভোরে বিশাল আকৃতির চুলায় বিশেষ পাত্রে সেই ধান সেদ্ধ করা হয়। এরপর দুই-তিন দিন কড়া রোদে উঠানে শুকিয়ে চালকলে ভাঙানোর পর মেলে সেই কাঙ্ক্ষিত ঝরঝরে চাল। একসময় বানারীপাড়ার ঘরে ঘরে কুটিয়ালদের ব্যস্ততা ছিল, যা আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ।

বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে নদীপথে ব্যবসায়ীরা ছুটে আসেন এই হাটে। বরগুনার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন যেমন এক নৌকা ধান নিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, এখানে ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া যায়, আবার ফেরার পথে তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের চালও কিনে নেওয়া যায়।

যাতায়াতে সময় ও দূরত্ব বেশি হলেও নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা এবং ব্যবসায়িক বিশ্বস্ততার কারণে তিনি দশকের পর দশক ধরে এই হাটে আসেন।

আগে যেখানে পালতোলা নৌকার আধিক্য ছিল, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে যন্ত্রচালিত ট্রলার বা ইঞ্জিন নৌকা। তবে নদীর বুকে সারি সারি নৌকায় ধান-চালের পসরা সাজানোর সেই চিরায়ত দৃশ্যটি বদলায়নি।

বানারীপাড়ার এই মূল হাট বসে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার। তবে আগের দিনের হাটের রেশ ধরে রবি ও বুধবারও কিছুটা বেচাকেনা চলে, যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘গালার হাট’। হাটের দিনগুলোয় পাইকার, কুটিয়াল আর শ্রমিকদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। এত ব্যস্ততার মধ্যেও রয়েছে এক অন্য রকম প্রশান্তি।

আরও পড়ুন

×