ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ক্যামেরার লেন্সে মানুষের জীবন

ক্যামেরার লেন্সে মানুষের জীবন
×
×

ছবি :: মুহাম্মদ এমদাদ হোসাইন

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৯ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিটি স্থিরচিত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একেকটি না-বলা জীবনের দীর্ঘশ্বাস। লেন্সের ক্যানভাসে যখন সামাজিক নিষ্ঠুর বাস্তবতা, জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম অভিঘাত আর প্রান্তিক মানুষের টিকে থাকার অদম্য আকুতি জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন ফ্রেম হয়ে ওঠে সময়ের প্রামাণ্য ইতিহাস। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার উত্তর ওয়াহেদপুর গ্রামের তরুণ মুহাম্মদ এমদাদ হোসাইন সে কাজটি করে চলেছেন নীরবে। 

চট্টগ্রাম কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এমদাদকে শৈশব থেকেই টানত চারপাশের নদী-মাটি, প্রকৃতি আর যাপিত জীবনের টানাপোড়েন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক আলোকচিত্র শিক্ষার সুযোগ কিংবা দামি ক্যামেরা কেনার আর্থিক সামর্থ্য তাঁর ছিল না। মোবাইল ফোনের লেন্সে পথচলা শুরু হলেও ২০১৬ সালে এসে তা আর মনের ক্ষুধা মেটাতে পারছিল না। তখন একটি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণ এবং মা-বাবার সঞ্চিত সামান্য অর্থ সম্বল করে কেনেন জীবনের প্রথম ডিএসএলআর ক্যামেরা।

এনজিওর কিস্তির টাকায় কেনা সে লেন্সই তাঁর সামনে উন্মোচন করে এক নতুন পৃথিবীকে। শুরুতে নিজেই ছবি তুলতেন, তারপর নিজের ভুলগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সংশোধন করতেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া শুরু হয় তাঁর স্বশিক্ষিত আলোকচিত্রীর জীবন।

২০২০ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘সলেন্ট নিউজ অ্যান্ড ফটো এজেন্সির’ ফ্রিল্যান্সার হিসেবে পেশাদারি ফটোসাংবাদিকতায় এমদাদের আনুষ্ঠানিক অভিষেক। এরপর ২০২২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানজনক ‘জুমা প্রেস’ এবং পরবর্তী সময়ে ইতালির ‘নুরফটো’র সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। কোনো একক প্রতিষ্ঠানে বাঁধাধরা চাকরিতে আবদ্ধ না থেকে ফ্রিল্যান্স কাজের স্বাধীনতা বেছে নিয়েছেন তিনি; যাতে অবাধে মাঠপর্যায়ে গিয়ে মুক্ত পাখির মতো সত্য ও মানুষের গল্প অনুসন্ধান করতে পারেন। 

এমদাদের লেন্স কেবল নন্দনতত্ত্বের আরাধনা করে না; এটি সমাজ, পরিবেশ, নদীদূষণ ও বাস্তুচ্যুতির মতো সংকটময় বাস্তবতায় অত্যন্ত সোচ্চার। তাঁর ক্যামেরায় বন্দি বেশ কিছু আলোকচিত্র বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে–

ঢাকার বর্জ্যের স্তূপ ও গৃহহীনতা: বুড়িগঙ্গার তীরে বিষাক্ত আবর্জনা ও কালো পানির পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা এক গৃহহীন নারী। এক ফ্রেমে চরম দারিদ্র্য ও পরিবেশদূষণের করুণ বাস্তবতাকে বিশ্ববাসীর সামনে এনে দেয় ছবিটি।

শ্যামনগরের জল সংকট: ২০২৩ সালের ১৫ মে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ধারণ করা দৃশ্য–চারপাশে থইথই জলরাশি অথচ পানের যোগ্য এক ফোঁটা মিষ্টিপানি নেই। মাইলের পর মাইল হেঁটে লবণাক্ততার গ্রাস থেকে মিষ্টিপানি সংগ্রহে ছুটে চলা এক বৃদ্ধা ও তাঁর নাতি।

ফেনীর বন্যা ও মানবিকতার আলো: ২০২৪ সালের আগস্টে ফেনীর ভয়াবহ বন্যায় প্লাস্টিকের নৌকায় অসহায় শিশু ও নারীকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রকৃতির তাণ্ডবের মুখেও মানুষের প্রতি মানুষের অমলিন মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে এ ছবিতে।

ঝড় ও জীবনের ঝুঁকি: ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ীর নির্জন বালুচরে কাজ করতে গিয়ে ভয়ংকর ধূলিঝড়ের মুখোমুখি হন এমদাদ। শূন্য দৃষ্টিসীমা আর চারপাশের অন্ধকারে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি শেখেন–প্রতিটি সংবাদের আড়ালে থাকে একজন আলোকচিত্রীর অসামান্য ত্যাগ।

বিশ্বের দেড় শতাধিক শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রকাশিত হয়েছে এমদাদের তোলা আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছবি। এর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য গার্ডিয়ান’, ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’, ‘দ্য টাইমস’, ‘বিবিসি’, ‘সিএনএন’, ‘ফোর্বস’ এবং ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। পাশাপাশি জাতিসংঘের প্রধান সংস্থাগুলো (ইউএন, ইউনেস্কো, এফএও, ইউএনডিআরআর) তাদের বিভিন্ন প্রকাশনায় ব্যবহার করেছে তাঁর ছবি।

পুরস্কারের ঝুলিও অমলিন। এ পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এমদাদ। তার মধ্যে ফ্রান্সের মর্যাদাপূর্ণ এএফপি ‘মারাই ফটো গ্রান্ট’, ইতালির ‘সিটি অব লাতিনা ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফি কম্পিটিশন’-এ ‘সারভাইভাল অ্যামিডস্ট পল্যুশন’ ছবির জন্য ওভারঅল উইনার হওয়া, যুক্তরাজ্যের ‘অ্যামাচার ফটোগ্রাফার ইয়াং এপিওউয়াই ২০২১’ এবং ‘দ্য জন রাসকিন প্রাইজ’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এমদাদের মতে, ভালো ছবির জন্য কেবল উচ্চমানের ক্যামেরা বা প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধৈর্য, ধারাবাহিকতা এবং মানুষের জীবনের প্রতি গভীর সহানুভূতি। তিনি তড়িঘড়ি করে শাটারে আঙুল চাপেন না; আগে মানুষের কাছে যান, তাদের দুঃখ-কষ্টের সহযাত্রী হন। যখন সেই মুহূর্তটি নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প বলতে শুরু করে, তখনই কেবল তাঁর ক্যামেরা কথা বলে ওঠে।

নিজের অর্জনের পেছনে পুরো পরিবারের বিশ্বাস ও অবদানকে শতভাগ স্বীকৃতি দেন এমদাদ। ভবিষ্যতে একটি একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, দীর্ঘমেয়াদি কাজের ওপর বই প্রকাশ এবং বিদেশে আলোকচিত্র ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। তবে সব স্বপ্নের কেন্দ্রে একটিই মূল লক্ষ্য– বাংলাদেশের মেহনতি মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি ও সত্যের গল্পকে বিশ্বমঞ্চে আরও বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরা।

আরও পড়ুন

×